
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ইং। রাত ১:০০ টায় মানিকসহ আল জাহের থেকে বের হলাম ওমরার উদ্দেশ্যে। আমি ও আনোয়ার ভাইয়ের সৌদি আরব যাওয়া ওমরাহ পালনের লক্ষে।
বিকালে বের হয়ে ইউনুছ ভাই, মানিকসহ মদিনা রোডে নাওরিয়ায় উম্মুল মোমেনীন হজরত মায়মুনা রা. এর কবর দেখতে। মহাসড়কের পাশে পাকা দেওয়ালে ঘেরা একটি সাধারণ কবর। কবরের চিহ্ন সরূপ মাটির সমান্তরালে ইটের দেওয়াল। নেই কোন মশারি, নেই কোন পাকা কবর, নেই কোন মাজার। এমনকি কবর রক্ষনাবেক্ষনের জন্য নেই কোন খাদেম। বাউন্ডারি ওয়ালে জানালায় গ্রিল দেওয়া আছে, যেন দর্শনার্থীরা ভেতরে কবর দেখতে পারে। আমাদের মতো আরো কয়েকজন দর্শনার্থী এসেছে। আমরা জেয়ারতের উদ্দেশ্যে দুআ পাঠ করলাম। বিশ্ব জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা. এর সর্বশেষ বিবাহিত স্ত্রী অতি সাধারণভাবে শুয়ে আছে মক্কা মদিনা মহাসড়কের পাশে নাওরিয়া নামক জায়গায়, যার পূর্বনাম শরাফ।
উম্মুল মোমেনীন মাইমুনা রা. কুরাঈশ বংশের হাওয়াজিন গোত্রের বিখ্যাত ব্যক্তি হারিস ইবেন হাযনের ঔরশে ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তার মাতা হিন্দ বিনতে আঊফ ছিলেন ইয়েমেনের হিমার নামক উপজাতিদের একজন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ‘বাররাহ’। তিনি ছিলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা. এর চাচা আব্বাস রা. এর স্ত্রীর বোন এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জেনারেল খালিদ ইবনে ওলীদের রা. এর ফুফু। তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল মাসউদ ইবনে আমরের সাথে। এরপর তাঁর বিয়ে হয় আবু রাহামের সাথে। আবু রাহাম কিছু দিন পরেই ইন্তেকাল করেন। তখন থেকেই তিনি নিজের পিতার সংসারে ছিলেন।
দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার জীবন আল্লাহর নবীর জন্য উৎসর্গ করলাম, আমি আল্লাহর নবীর খেদমতে আমার জীবন অতিবাহিত করতে ইচ্ছুক’ । বিশ্বনবী সা. হুদায়বিয়া সন্ধির পরের বছর যখন মক্কায় ওমরা করতে এলেন, সে সময় রাসুল সা. এর চাচা আব্বাস রা. এর প্রচেষ্টায় নবী সা. বাররাহ ওরফে মাইমুনা রা. কে বিয়ে করতে রাজী হন। মক্কা নগরী থেকে প্রায় দশ মাইল দূরে, শরাফ নামক স্থানে, নবী সা. এর সাথে তার বিয়ে হয় এবং বিয়ে স্বয়ং আব্বাস রা. পড়িয়েছিলেন।
সে সময়ে ইসলামের একজন পণ্ডিত হিসাবে তাঁর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রচুর দান করতেন। গরীব আত্মীয়দের প্রতি তার মমতা ছিল অধিক। আয়েশা রা. তাঁর সম্পর্কে বলতেন, “আমাদের মধ্যে তিনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করতেন এবং আত্মীয়দের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন”।
অভাবীদের দান করতে করতে গিয়ে একদা তিনি বিরাট অঙ্কের অর্থ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই ঋণ আপনি পরিশোধ করবেন কি করে?
উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের ইচ্ছা পোষণ করে, আল্লাহ তাকে সে ব্যবস্থা করে দেন।
মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই মক্কা নগরীর অদূরে যে পল্লীতে তাদের বিয়ে হয়েছিল, সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসুল সা. এর ইন্তেকালের পরে কিছুদিন তিনি মদিনায় থাকলেও, শেষ বয়সে তিনি মক্কার সেই পল্লীতে ফিরে এসেছিলেন, যেখানে তিনি রাসুল সা. এর সাথে প্রথম সাক্ষাত পেয়েছিলেন। অতীত স্মৃতি আঁকড়ে ধরে, সেখানেই তিনি এবাদত গুজার করতেন। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাদের বিয়ের সময় রাসুল সা. এর বয়স ছিল ৫৮ বছর এবং মাইমুনা রা. এর বয়স ৩০ এর কোটায়। তিনি যখন ৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে মারা যান তখন তাঁর বয়স প্রায় ৮০ বছরের মত। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ সা. এর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মায়মুনা রা. তাঁর সাথেই বসবাস করতেন।
তাঁর নামাজে জানাযার ইমামতি করেছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী তাঁরই বোন পো, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এবং তিনিই তাঁকে কবরে নামিয়ে শুইয়ে দিয়েছিলেন। এই আবুদল্লাহ ইবনে আব্বাস যখন শিশু বয়সে খালার কাছে বেড়াতে যেতেন, তখন রাসুল সা. এর একান্ত এবাদত ও পারিবারিক জীবনকে কাছে থেকে নিজ চক্ষে দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি বহু হাদিসে এসব বর্ণনা করেছেন তাছাড়া এই হাদিসের সবগুলোই খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর খালাম্মার লাশ বহনকারীদের বারবার সতর্ক করছিলেন এই বলে যে, ‘লোকসকল তোমরা সাবধান! এটা আল্লাহর রাসুলের স্ত্রীর লাশ। বেয়াদবী যেন না হয়, বেশী নড়াচড়া করো না এবং যত্ম ও ইজ্জতের সহিত লাশ নিয়ে চলো।
ইসলামের ইতিহাসের এক মহীয়সী নারী বিশ্ব নবির পত্নী ও উম্মুল মোমেনীন হজরত মায়মুনা রা. এর কবর জেয়ারত করে প্রশান্ত চিত্তে আমরা আল্লাহর ঘর কাবার দিকে ফিরে আসি।
লেখক : মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
প্রকাশক ও সম্পাদক : এম, এইচ মোতালেব খান, নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ মনির হোসেন কাজী
ঠিকানা : ৩৪০/এ, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪, মোবাইল : ০১৯ ১১৮০ ৪৫৮১
2025 © All rights reserved দৈনিক মাতৃছায়া