অপরাধ প্রতিবেদক : রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে আউয়াল টাওয়ারে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে স্পা ব্যবসার আড়ালে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। বাবুল ও শিমুল নামের দুই ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। প্রশাসনের একাংশের আশীর্বাদে এবং প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে তারা রাজধানীতে একের পর এক স্পা খুলে সেখানে মাদক, দেহব্যবসা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অবাধ দৌরাত্ম্য চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো বাবুল-শিমুল সিন্ডিকেটের গোপন কারবারের ভয়াবহ চিত্র।
প্রাথমিকভাবে ‘ওয়েলনেস’, ‘থেরাপি’, ‘সেলুন অ্যান্ড স্পা’ নামের বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হলেও, ভেতরে রয়েছে এক ভয়াবহ অন্ধকার জগত। বাবুল ও শিমুলের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট বনানী ও গুলশান এলাকায় অন্তত ৮টি স্পা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই নামসর্বস্ব রেজিস্ট্রেশন করা হলেও কার্যক্রম পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। সেখানে নিয়মিত আসা যাওয়া করেন উচ্চবিত্ত শ্রেণির কিছু তরুণ, প্রভাবশালী রাজনীতিক, এমনকি কিছু বিদেশিও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব স্পাতে ‘থাই ম্যাসাজ’ ও ‘বডি থেরাপি’র নামে তরুণীদের দিয়ে আপত্তিকর কাজ করানো হয়। নারীদের একটি বড় অংশকে গ্রামের সহজ-সরল পরিবার থেকে চাকরির প্রলোভনে ঢাকায় আনা হয়। প্রথমে তাদেরকে ‘রিসেপশনিস্ট’ বা ‘থেরাপিস্ট’ হিসেবে নিয়োগ দিলেও কিছুদিন পরই মাদক ও যৌন বাণিজ্যে বাধ্য করা হয় বলে জানা যায়। এসব স্পাতে ইয়াবা, আইস, সিসা ও বিদেশি মদের অবাধ ব্যবহার হয়। অভিজাত এলাকার অবস্থান ও প্রশাসনের প্রশ্রয়ে দিনের পর দিন এসব অপরাধ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে সিন্ডিকেটটি।
সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা বাবুল একসময় সাধারণ পার্লারের কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এবং পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের মদদে তিনি গড়ে তুলেছেন বিস্তৃত অপরাধ জাল। অপর হোতা শিমুল আগে এক কনসালটেন্সি ফার্মে চাকরি করতেন, পরে বাবুলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্পা ব্যবসার আড়ালে মাদক ও নারী ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মেয়েদের বাসা ভাড়া নিয়ে রাখেন এবং বিভিন্ন ‘স্পা’র জন্য সরবরাহ করেন। গোপন ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করে এরপর সেসব ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করাও তাদের অন্যতম কৌশল।
এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম দিনের পর দিন চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো অভিযান দেখা যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, বনানী থানা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কিছু সদস্য নিয়মিত এই স্পাগুলোর কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ গ্রহণ করে। প্রতিমাসে বাবুল-শিমুল সিন্ডিকেট কয়েক লাখ টাকা ভাগাভাগি করে দেয় বিভিন্ন মহলে। তাছাড়া কিছু গণমাধ্যমকর্মী, সেলিব্রিটি ও প্রভাবশালী নারীদের নাম ব্যবহার করে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেয়।
স্পাগুলোর অধিকাংশেরই নেই সঠিক ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্য সনদ বা নগর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। কিছু ফ্র্যাঞ্চাইজড নাম ব্যবহার করে তারা গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করে। এমনকি বিদেশি নাম ব্যবহার করে বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বা বিনিয়োগ করেছেন।
এই অবৈধ স্পাগুলোর কারণে সমাজে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ-তরুণীরা সহজেই মাদক ও অশ্লীলতার ফাঁদে পড়ছে। অভিভাবকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, কারণ অনেক ছেলেমেয়ে এমন স্পার মাধ্যমে জড়িয়ে যাচ্ছে অপরাধ জগতে।
কোন এক অজানা কারণে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ ছাপা হওয়ার পরেও র্যাব ও এনসিবির (নেশা নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো) দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছেনা। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো কিছু অভিযান লক্ষ করা গেলেও এখনো কার্যকর কোনো অভিযান নজরে আসেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ করলেও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, “এই ধরনের অপরাধ চক্রকে ভাঙতে হলে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্নীতিও বন্ধ করতে হবে। আর যারা এই চক্রে পেছন থেকে মদদ দিচ্ছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।”
প্রকাশক ও সম্পাদক : এম, এইচ মোতালেব খান, নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ মনির হোসেন কাজী
ঠিকানা : ৩৪০/এ, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪, মোবাইল : ০১৯ ১১৮০ ৪৫৮১
2025 © All rights reserved দৈনিক মাতৃছায়া