০২:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশুরার ইতিহাস নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কথা

  • এস. ই. ইসলাম
  • আপডেটের সময় : ০৯:১৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ জুলাই ২০২৫
  • ৯৩১ টাইম ভিউ

=================

এস. ই. ইসলাম

=================

আশুরার পূর্ণ ইতিহাস, কাহিনী, উদাহরণ এবং বিবরণসহ আলোচনা করলে এটি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়বিদারক বিষয়ের একটি হয়ে দাঁড়ায়। এই দিন শুধু রোযা কিংবা করুণার নয়, বরং শিক্ষা, ত্যাগ, ঈমান ও ন্যায়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আশুরার পূর্ণ ইতিহাস একটি বিস্তৃত ও গভীর বিষয়, যা ইসলামের নানান সময়কাল এবং ঘটনার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

নিচে আশুরার পূর্ণ ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো—পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদীস এবং ইসলামী ঐতিহ্যের আলোকে:
আশুরা: সংজ্ঞা ও তাৎপর্য
শব্দগত অর্থ: “আশুরা” এসেছে আরবি শব্দ ‘আশারা’ থেকে, যার অর্থ ‘দশ’।
ইসলামী অর্থে: মুহররম মাসের ১০ তারিখ, যেটি ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাসের গুরুত্বপূর্ণ দিন।
ইতিহাসের আলোকে আশুরার তাৎপর্য ও পূর্ব যুগের আশুরা:
মক্কার কুরাইশরাও মুহররমের ১০ তারিখ রোযা রাখতেন। তারা বিশ্বাস করত এটি একটি পবিত্র দিন। নবী করীম (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন দেখেন ইহুদিরাও রোযা রাখে। তারা বলে, “এই দিনে মুসা (আ.) ও তাঁর কওম ফেরাউন থেকে মুক্তি পায়।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:“আমরা মুসার অনুসারী হিসেবে তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।” (বুখারী, মুসলিম)
তারপর তিনি নিজেও রোযা রাখেন এবং সাহাবীদের তা রাখতে বলেন।

আশুরার দিন যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে (ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী):
১. আদম (আ.)-এর তওবা কবুল- আল্লাহ এই দিনে তার তওবা গ্রহণ করেন।
২. নূহ (আ.)-এর কিশতী পাহাড়ে থামে- জুদি পর্বতের ওপর থামে (সূরা হূদ, আয়াত ৪৪)।
৩. ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে ফেলা হয়- তিনি অলৌকিকভাবে রক্ষা পান (সূরা আম্বিয়া, ৬৯)।
৪. মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলের মুক্তি- লোহিত সাগর বিভক্ত হয়, ফেরাউন সলিল সমাধি হয় (সূরা শোয়ারা, ৬৩-৬৬)।
৫. ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান- আল্লাহর রহমতে তিনি মুক্ত হন (সূরা আস-সাফফাত, ১৩৯-১৪৮)।
৬. আয়ূব (আ.)-এর রোগ মুক্তি- দীর্ঘ রোগভোগের পর আরোগ্য লাভ করেন।
এসব ঘটনা হাদীস ও ঐতিহ্যে বর্ণিত, যদিও সময় নির্ধারণে কিছুটা মতভেদ আছে।

কারবালার ট্র্যাজেডি: আশুরার প্রধান শিক্ষা:

পটভূমি:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরে খিলাফত ধীরে ধীরে রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ খলিফা হয়। তিনি ইসলামবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলেন—মদ্যপান, অবিচার, অত্যাচার ইত্যাদি।

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর অবস্থান:
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র। তিনি ইয়াজিদের বায়আত (আনুগত্য) প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন একজন জালেম শাসক ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

কারবালার ঘটনা ধাপে ধাপে:
১. কুফাবাসীর আমন্ত্রণ- তারা হুসাইন (রা.)-কে আমন্ত্রণ জানায় ইয়াজিদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে।
২. হিজরত- তিনি পরিবার ও সাহাবীদের নিয়ে মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা দেন।
৩. প্রতারণা- ইয়াজিদের গভর্নর ইবনে জিয়াদ কুফার জনগণকে ভয় দেখিয়ে হুসাইনের বিরুদ্ধে করে।
৪. কারবালায় অবরোধ- হুসাইন (রা.)-কে কারবালায় আটকে রাখা হয়। খাবার ও পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
৫. ১০ মুহররমু যুদ্ধ- হুসাইন (রা.) ও তার ৭২ জন সাথী শহীদ হন। শিশুরাও রেহাই পায়নি।
৬. শাহাদাত- ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাথা কেটে ইয়াজিদের দরবারে পাঠানো হয়।

শহীদদের নাম :
১. ইমাম হুসাইন (রা.)
২. আলী আকবর (হুসাইনের পুত্র)
৩. আলী আসগর (৬ মাস বয়সী শিশু)
৪. আব্বাস ইবনে আলী (ভাই)
৫. জয়নুল আবেদীন (বেঁচে থাকেন, পরবর্তী ইমাম)

শিক্ষা ও উদাহরণ:
১. সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো – হুসাইন (রা.)-এর জীবন এটি প্রতিফলিত করে।
২. অন্যায় শক্তিকে অস্বীকার- ইয়াজিদেও বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ।
৩. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল-খাদ্য, পানি, সহচর হারিয়েও ধৈর্য হারাননি।
৪. ইসলাম রক্ষায় আত্মত্যাগ-ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষায় নিজের ও পরিবারের আত্মত্যাগ।

আশুরার আমলসমূহ (হাদীসের আলোকে):
১. রোযা রাখা:
রাসূল (সা.) বলেন:“আমি আশা করি যে আশুরার রোযা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।” (সহীহ মুসলিম)
২. তাসুয়া ও আশুরা (৯ ও ১০ মুহররম):
ইহুদিদের থেকে আলাদা হতে তিনি বলেন:“তোমরা ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোযা রাখ।” (আহমাদ)
৩. সদকা দেওয়া:
আশুরার দিনে বেশি সদকা করলে আল্লাহ সারা বছর তা ফিরিয়ে দেন। (বায়হাকী)
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক উন্নয়ন:
এই দিনে আত্মীয়তার সম্পর্ক জোরদার করার জন্য পুরস্কার রয়েছে।

আশুরার ভুলপ্রচলিত কাজ: কাজ -ইসলাম কি বলে

❌ মাতম, শরীরে আঘাত, রক্তপাত- হারাম (নিজেকে কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ, সহীহ হাদীস অনুযায়ী)
❌ শোক পালনকে ‘ওয়াজিব’ ভাবা- (ইসলামে নির্দিষ্ট দিনের শোক পালন নেই)
❌ বিদআতি রীতিনীতি – (ধর্মে অতিরিক্ত কার্যকলাপ সংযোজনের অনুমতি নেই)

আশুরা পালনের ইতিহাস ও রীতিনীতি বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয়, যা অনেকাংশে সংশ্লিষ্ট সমাজের ধর্মীয় চিন্তা, মতবাদ (সুন্নি-শিয়া ভেদে), সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক পটভূমির ওপর নির্ভরশীল। নিচে বিভিন্ন দেশে আশুরা পালনের পূর্ণ ইতিহাস, রীতি, কাহিনী, উদাহরণ ও বিবরণসহ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।

আশুরা পালনের মূল উৎস:

মুসলিম বিশ্বে আশুরার তাৎপর্য দুইভাবে দেখা যায়:
১. সুন্নি মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি:
মুহররমের ১০ তারিখকে গুরুত্ব দিয়ে রোযা রাখা, নফল ইবাদত করা, দান-সদকা করা ইত্যাদি আমল করে। মূলত নবী মুসা (আ.)-এর ফেরাউন থেকে মুক্তি ও নবীজী (সা.)-এরহাদীস অনুযায়ী এই দিনে রোযা রাখাকে কেন্দ্র করে পালন করা হয়। কারবালার ঘটনা স্মরণ করলেও, মাতম বা শোকপ্রকাশ করে না।
২. শিয়া মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে শোক পালন করে। আশুরার ১০ দিন আগে থেকে শুরু করে ১০ মুহররম পর্যন্ত “মাজলিস”, “মাতম”, “জঞ্জির” প্রভৃতি শোকানুষ্ঠান করে থাকে। তাদের মতে, এই দিন শুধুই রোযার নয় বরং প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, শোক ও দুঃখের দিন।

বিভিন্ন দেশে আশুরা পালনের ইতিহাস, কাহিনী ও উদাহরণ:

১. সৌদি আরব (বিশেষত মক্কা-মদিনা):
সুন্নি গঠনভিত্তিক দেশ। সরকারি বা প্রকাশ্যভাবে শোক পালন হয় না। আশুরার রোযা, নফল নামাজ, তওবা, কোরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি করা হয়। হাদীস অনুযায়ী আশুরা উপলক্ষে খাদ্য বিতরণ, আত্মীয়তা রক্ষা প্রচলিত।
উদাহরণ:হাদীসের ভিত্তিতে ৯ ও ১০ মুহররম বা ১০ ও ১১ তারিখ রোযা রাখা উৎসাহিত হয়।

২. ইরান:
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আশুরা সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর একটি। “তাজিয়া”, “নওহা”, “মাজলিস”, “মাতম” ও “জঞ্জির জানি” প্রচলিত। কারবালার ঘটনার নাট্যরূপ (“রোজেহ”) মঞ্চায়িত করা হয়। রাস্তায় কালো কাপড়, লাল নিশান ও কারবালার প্রতীকী আলাম উড়ানো হয়।
উদাহরণ: “ইয়া হুসাইন!” ধ্বনিতে রাস্তায় মাতমকারীদের দেখা যায়। তারা নিজেদের বুক চাপড়ায়, কেউ কেউ রক্তও বের করে ফেলে প্রতীকীভাবে।

৩. ইরাক:
শিয়া মুসলমানদের প্রধান কেন্দ্র। কারবালা এখানেই অবস্থিত। আশুরার মূল অনুষ্ঠান হয় কারবালা শহরে ু ইমাম হুসাইনের মাজারে। লক্ষ লক্ষ মানুষ “আরবাঈন” (৪০ দিন পর) পর্যন্ত হেঁটে পায়ে হুসাইনের দরবারে পৌঁছায়। শোক যাত্রা, খাবার বিতরণ (নজর-নিয়াজ), মাতম, ধর্মীয় আলোচনা হয়।
উদাহরণ:প্রতিবার আশুরায় প্রায় ২-৩ কোটি মুসলমান কারবালায় জড়ো হন। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড়বাৎসরিক ধর্মীয় জমায়েতগুলোর একটি।

৪. পাকিস্তান:
সুন্নি-শিয়া উভয় সম্প্রদায় আছে। শিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী আশুরা পালন আছে। শহরের রাস্তায় তাজিয়া মিছিল, জঞ্জির মাতম, কারবালার নাট্য উপস্থাপনা হয়। সুন্নিরা রোযা রাখে, ইবাদত করে, কারবালার ঘটনা স্মরণ করে। সরকার বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়।
উদাহরণ:করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদে আলাদা আলাদা শিয়া এলাকা থেকে তাজিয়া বের হয়। সরকার তাদের জন্য রুট নির্ধারণ করে দেয়।

৫. ভারত:
মুসলমানদের মধ্যে শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায় প্রচুর। লখনৌ, হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, কলকাতা ও দিল্লি শহরে বড় বড় শোক মিছিল হয়। তাজিয়া, আলম বের হয়। হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে নাট্য উপস্থাপন, আলোচনা হয়। সুন্নিরাও আশুরা উপলক্ষে রোযা রাখে ও ইবাদত করে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ:মুঘল আমলে আশুরা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হতো। বাদশাহ নিজেও মাজলিসে যোগ দিতেন।

৬. বাংলাদেশ:
সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও শিয়া সম্প্রদায় ছোট পরিসরে আশুরা পালন করে। ঢাকার হোসেনি দালান আশুরা পালন ও শোক মিছিলে কেন্দ্রবিন্দু। প্রতীকীভাবে তাজিয়া মিছিল বের হয়, “হায় হুসাইন!” ধ্বনি তোলা হয়। অনেক সুন্নি আশুরা উপলক্ষে রোযা রাখেন, কোরআন খতম দেন।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ:হোসেনি দালান নির্মাণ করেছিলেন মুঘল আমলের শিয়া কর্মকর্তা। এটি শত শত বছর ধরে আশুরার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৭. লেবানন:
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিজবুল্লাহ-এর প্রভাব রয়েছে। আশুরার দিনে আর্মড শোক মিছিল, ধর্মীয় বক্তৃতা, প্রতীকী যুদ্ধ প্রদর্শন হয়। হুসাইনের আত্মত্যাগকে আধুনিক রাজনীতি ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
উদাহরণ:আশুরার ভাষণে বলা হয়: “প্রত্যেক যুগে ইয়াজিদ আছে, এবং হুসাইনের আত্মত্যাগ আজও প্রাসঙ্গিক।”

৮. তুরস্ক:
বেশিরভাগ সুন্নি হানাফি মুসলমান। আশুরার দিনে রোযা রাখা, বিশেষ দোয়া করা প্রচলিত। আশুরা পুডিং (Asure) তৈরি করে বিতরণ করা হয়।
ঐতিহ্য:তুর্কিরা বিশ্বাস করে এই দিনে নূহ (আ.) নৌকা থেকে নেমে যা যা পেয়েছিলেন তা দিয়ে এই পুডিং তৈরি করেছিলেন।

৯. আফগানিস্তান:
শিয়া হাজারা সম্প্রদায় আশুরা ঘটা করে পালন করে। আত্মত্যাগ, শোক, নাট্য রূপদান, আলম, তাজিয়া দেখা যায়। তালিবান শাসনকালে এসব বন্ধ ছিল, তবে কিছু এলাকায় গোপনে চলত।

সারসংক্ষেপে বিভিন্ন দেশের আশুরা উদাহরণ:
দেশ -ধরন -প্রধান রীতি
সৌদি আরব- সুন্নি- রোযা, ইবাদত
ইরান- শিয়া- মাতম, নাটক, আলম
ইরাক- শিয়া- কারবালায় মিলন, শোক
পাকিস্তান- উভয়- তাজিয়া, শোক-মিছিল
ভারত- উভয়- তাজিয়া, নাট্য উপস্থাপন
বাংলাদেশ- সুন্নি প্রধান- রোযা, হোসেনি দালান
তুরস্ক- সুন্নি- আশুরা পুডিং, রোযা
লেবানন- শিয়া- রাজনৈতিক-ধর্মীয় শোক

বিভিন্ন ইসলামী মনীষী, আলেম, ইতিহাসবিদ এবং সুফি সাধকরা আশুরা নিয়ে গভীর মন্তব্য ও বিশ্লেষণ করেছেন। নিচে কিছু মহান ব্যক্তির মন্তব্য তুলে ধরা হলো:
১. মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন- “আশুরার রোজা রাখো। আমি আশা করি, আল্লাহ তা’আলা এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম)
২. ইমাম হুসাইন (রা.) বলেন – “আমি যুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং উম্মতের মধ্যে সংশোধন আনতে চাচ্ছি।”(তালাবুল ইস্লাহ ু কারবালার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা)
৩. ইমাম জয়নুল আবেদীন বলেন – “কারবালার দিন ছিল আমাদের জন্য দুঃখ, ব্যথা ও কান্নার দিন। এটা কোনো উৎসবের দিন নয়।”
৪. ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন -“যারা আশুরাকে আনন্দ-উৎসবে পরিণত করেছে, তারা ইসলামি চেতনা হারিয়েছে। আশুরা শোক ও আত্মসমালোচনার দিন।”
৫. ইবনে কাসির (রহ.) ইসলামি ইতিহাসবিদ- “কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক এক অধ্যায়। হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের অবিচল প্রতিবাদ।”
৬. শেখ সাদী (রহ.)- “হুসাইনের পথ হচ্ছে আল্লাহর পথে আত্মত্যাগের পথ। তিনি দেখিয়ে গেছেন, অন্যায়ের সাথে আপস নয়, বরং আত্মদান শ্রেয়।”
৭. মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)- “ইমাম হুসাইনের আন্দোলন ছিল একটি নৈতিক বিপ্লব। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী মূল্যবোধকে রক্ষা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ।”
৮. ড. আলী শরীয়তী (ইরানী চিন্তাবিদ)-“হুসাইন (রা.) কেবল একজন শহীদ নন; তিনি হলেন মানবতার মুক্তির প্রতীক, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরকালীন এক বাণী হয়ে আছেন।”
৯. মাওলানা রুমী (রহ.)- “হুসাইনের রক্ত আমাদের আত্মার রঙ। তিনি ছিলেন প্রেমের শহীদ, যে প্রেম আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত।”
১০. খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)- “যদি আমি কারবালার সময়ে থাকতাম, তবে হুসাইনের পাশে থেকে জান দিয়ে দিতাম।”

আধুনিক সময়ের চিন্তাবিদরা:

১. আল্লামা ইকবাল বলেন – “ইসলামের বাস্তব শিক্ষা পুনর্জাগরণের জন্য হুসাইনের কারবালা আজও প্রেরণা।”
২. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র (উদ্ধৃত হয়েছে বিভিন্ন লেখায়)- “ইমাম হুসাইন ও তাঁর অনুসারীরা যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা মানবিক ন্যায়বোধের জন্য এক মহৎ উদাহরণ।”

আশুরা হলো ইতিহাসের এক বিশাল শিক্ষণীয় দিন। নবীদের জীবনের ঘটনাবলিতে ঈমান ও তাওবার উদাহরণ আমরা পেয়ে থাকি। কারবালার ঘটনার মাধ্যমে আমরা শিখি সাহসিকতা, সত্যবাদিতা ও আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা। আশুরা শুধু ইতিহাস নয়, এটি আত্মত্যাগের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ধ্বনি, ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ও বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ঐক্যের অনুপম নজির।আশুরা শুধু শোকের দিন নয়; এটি স্মরণ, শিক্ষা ও সচেতনতামূলক দিন। এই দিনে আমরা— অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই, আত্মশুদ্ধি করি, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকি।

লেখক:- এ্যাড. এস. ই. ইসলাম
চেয়ারম্যান:- বাংলাদেশ “ল” ফাউন্ডেশন এন্ড জুরিষ্টস
আজীবন সদস্য:- ঢাকা ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশন।
আইন উপদেষ্টা:- মানবাধিকার খবর।
বিশেষ প্রতিনিধি:- বাংলাদেশ আমেরিকান প্রেস সার্ভিস।
উপদেষ্টা:- নতুন অর্থনীতি,বহু গ্রন্থের লেখক ও কলামিষ্ট।

ট্যাগ:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক তথ্য সম্পর্কে

ছয় দিন ধরে বন্ধ চার চা বাগান, ডিসির কাছে শ্রমিকদের স্মারকলিপি

আশুরার ইতিহাস নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কথা

আপডেটের সময় : ০৯:১৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ জুলাই ২০২৫

=================

এস. ই. ইসলাম

=================

আশুরার পূর্ণ ইতিহাস, কাহিনী, উদাহরণ এবং বিবরণসহ আলোচনা করলে এটি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়বিদারক বিষয়ের একটি হয়ে দাঁড়ায়। এই দিন শুধু রোযা কিংবা করুণার নয়, বরং শিক্ষা, ত্যাগ, ঈমান ও ন্যায়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আশুরার পূর্ণ ইতিহাস একটি বিস্তৃত ও গভীর বিষয়, যা ইসলামের নানান সময়কাল এবং ঘটনার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

নিচে আশুরার পূর্ণ ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো—পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদীস এবং ইসলামী ঐতিহ্যের আলোকে:
আশুরা: সংজ্ঞা ও তাৎপর্য
শব্দগত অর্থ: “আশুরা” এসেছে আরবি শব্দ ‘আশারা’ থেকে, যার অর্থ ‘দশ’।
ইসলামী অর্থে: মুহররম মাসের ১০ তারিখ, যেটি ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাসের গুরুত্বপূর্ণ দিন।
ইতিহাসের আলোকে আশুরার তাৎপর্য ও পূর্ব যুগের আশুরা:
মক্কার কুরাইশরাও মুহররমের ১০ তারিখ রোযা রাখতেন। তারা বিশ্বাস করত এটি একটি পবিত্র দিন। নবী করীম (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন দেখেন ইহুদিরাও রোযা রাখে। তারা বলে, “এই দিনে মুসা (আ.) ও তাঁর কওম ফেরাউন থেকে মুক্তি পায়।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:“আমরা মুসার অনুসারী হিসেবে তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।” (বুখারী, মুসলিম)
তারপর তিনি নিজেও রোযা রাখেন এবং সাহাবীদের তা রাখতে বলেন।

আশুরার দিন যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে (ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী):
১. আদম (আ.)-এর তওবা কবুল- আল্লাহ এই দিনে তার তওবা গ্রহণ করেন।
২. নূহ (আ.)-এর কিশতী পাহাড়ে থামে- জুদি পর্বতের ওপর থামে (সূরা হূদ, আয়াত ৪৪)।
৩. ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে ফেলা হয়- তিনি অলৌকিকভাবে রক্ষা পান (সূরা আম্বিয়া, ৬৯)।
৪. মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলের মুক্তি- লোহিত সাগর বিভক্ত হয়, ফেরাউন সলিল সমাধি হয় (সূরা শোয়ারা, ৬৩-৬৬)।
৫. ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান- আল্লাহর রহমতে তিনি মুক্ত হন (সূরা আস-সাফফাত, ১৩৯-১৪৮)।
৬. আয়ূব (আ.)-এর রোগ মুক্তি- দীর্ঘ রোগভোগের পর আরোগ্য লাভ করেন।
এসব ঘটনা হাদীস ও ঐতিহ্যে বর্ণিত, যদিও সময় নির্ধারণে কিছুটা মতভেদ আছে।

কারবালার ট্র্যাজেডি: আশুরার প্রধান শিক্ষা:

পটভূমি:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরে খিলাফত ধীরে ধীরে রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ খলিফা হয়। তিনি ইসলামবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলেন—মদ্যপান, অবিচার, অত্যাচার ইত্যাদি।

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর অবস্থান:
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র। তিনি ইয়াজিদের বায়আত (আনুগত্য) প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন একজন জালেম শাসক ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

কারবালার ঘটনা ধাপে ধাপে:
১. কুফাবাসীর আমন্ত্রণ- তারা হুসাইন (রা.)-কে আমন্ত্রণ জানায় ইয়াজিদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে।
২. হিজরত- তিনি পরিবার ও সাহাবীদের নিয়ে মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা দেন।
৩. প্রতারণা- ইয়াজিদের গভর্নর ইবনে জিয়াদ কুফার জনগণকে ভয় দেখিয়ে হুসাইনের বিরুদ্ধে করে।
৪. কারবালায় অবরোধ- হুসাইন (রা.)-কে কারবালায় আটকে রাখা হয়। খাবার ও পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
৫. ১০ মুহররমু যুদ্ধ- হুসাইন (রা.) ও তার ৭২ জন সাথী শহীদ হন। শিশুরাও রেহাই পায়নি।
৬. শাহাদাত- ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাথা কেটে ইয়াজিদের দরবারে পাঠানো হয়।

শহীদদের নাম :
১. ইমাম হুসাইন (রা.)
২. আলী আকবর (হুসাইনের পুত্র)
৩. আলী আসগর (৬ মাস বয়সী শিশু)
৪. আব্বাস ইবনে আলী (ভাই)
৫. জয়নুল আবেদীন (বেঁচে থাকেন, পরবর্তী ইমাম)

শিক্ষা ও উদাহরণ:
১. সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো – হুসাইন (রা.)-এর জীবন এটি প্রতিফলিত করে।
২. অন্যায় শক্তিকে অস্বীকার- ইয়াজিদেও বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ।
৩. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল-খাদ্য, পানি, সহচর হারিয়েও ধৈর্য হারাননি।
৪. ইসলাম রক্ষায় আত্মত্যাগ-ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষায় নিজের ও পরিবারের আত্মত্যাগ।

আশুরার আমলসমূহ (হাদীসের আলোকে):
১. রোযা রাখা:
রাসূল (সা.) বলেন:“আমি আশা করি যে আশুরার রোযা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।” (সহীহ মুসলিম)
২. তাসুয়া ও আশুরা (৯ ও ১০ মুহররম):
ইহুদিদের থেকে আলাদা হতে তিনি বলেন:“তোমরা ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোযা রাখ।” (আহমাদ)
৩. সদকা দেওয়া:
আশুরার দিনে বেশি সদকা করলে আল্লাহ সারা বছর তা ফিরিয়ে দেন। (বায়হাকী)
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক উন্নয়ন:
এই দিনে আত্মীয়তার সম্পর্ক জোরদার করার জন্য পুরস্কার রয়েছে।

আশুরার ভুলপ্রচলিত কাজ: কাজ -ইসলাম কি বলে

❌ মাতম, শরীরে আঘাত, রক্তপাত- হারাম (নিজেকে কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ, সহীহ হাদীস অনুযায়ী)
❌ শোক পালনকে ‘ওয়াজিব’ ভাবা- (ইসলামে নির্দিষ্ট দিনের শোক পালন নেই)
❌ বিদআতি রীতিনীতি – (ধর্মে অতিরিক্ত কার্যকলাপ সংযোজনের অনুমতি নেই)

আশুরা পালনের ইতিহাস ও রীতিনীতি বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয়, যা অনেকাংশে সংশ্লিষ্ট সমাজের ধর্মীয় চিন্তা, মতবাদ (সুন্নি-শিয়া ভেদে), সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক পটভূমির ওপর নির্ভরশীল। নিচে বিভিন্ন দেশে আশুরা পালনের পূর্ণ ইতিহাস, রীতি, কাহিনী, উদাহরণ ও বিবরণসহ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।

আশুরা পালনের মূল উৎস:

মুসলিম বিশ্বে আশুরার তাৎপর্য দুইভাবে দেখা যায়:
১. সুন্নি মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি:
মুহররমের ১০ তারিখকে গুরুত্ব দিয়ে রোযা রাখা, নফল ইবাদত করা, দান-সদকা করা ইত্যাদি আমল করে। মূলত নবী মুসা (আ.)-এর ফেরাউন থেকে মুক্তি ও নবীজী (সা.)-এরহাদীস অনুযায়ী এই দিনে রোযা রাখাকে কেন্দ্র করে পালন করা হয়। কারবালার ঘটনা স্মরণ করলেও, মাতম বা শোকপ্রকাশ করে না।
২. শিয়া মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে শোক পালন করে। আশুরার ১০ দিন আগে থেকে শুরু করে ১০ মুহররম পর্যন্ত “মাজলিস”, “মাতম”, “জঞ্জির” প্রভৃতি শোকানুষ্ঠান করে থাকে। তাদের মতে, এই দিন শুধুই রোযার নয় বরং প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, শোক ও দুঃখের দিন।

বিভিন্ন দেশে আশুরা পালনের ইতিহাস, কাহিনী ও উদাহরণ:

১. সৌদি আরব (বিশেষত মক্কা-মদিনা):
সুন্নি গঠনভিত্তিক দেশ। সরকারি বা প্রকাশ্যভাবে শোক পালন হয় না। আশুরার রোযা, নফল নামাজ, তওবা, কোরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি করা হয়। হাদীস অনুযায়ী আশুরা উপলক্ষে খাদ্য বিতরণ, আত্মীয়তা রক্ষা প্রচলিত।
উদাহরণ:হাদীসের ভিত্তিতে ৯ ও ১০ মুহররম বা ১০ ও ১১ তারিখ রোযা রাখা উৎসাহিত হয়।

২. ইরান:
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আশুরা সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর একটি। “তাজিয়া”, “নওহা”, “মাজলিস”, “মাতম” ও “জঞ্জির জানি” প্রচলিত। কারবালার ঘটনার নাট্যরূপ (“রোজেহ”) মঞ্চায়িত করা হয়। রাস্তায় কালো কাপড়, লাল নিশান ও কারবালার প্রতীকী আলাম উড়ানো হয়।
উদাহরণ: “ইয়া হুসাইন!” ধ্বনিতে রাস্তায় মাতমকারীদের দেখা যায়। তারা নিজেদের বুক চাপড়ায়, কেউ কেউ রক্তও বের করে ফেলে প্রতীকীভাবে।

৩. ইরাক:
শিয়া মুসলমানদের প্রধান কেন্দ্র। কারবালা এখানেই অবস্থিত। আশুরার মূল অনুষ্ঠান হয় কারবালা শহরে ু ইমাম হুসাইনের মাজারে। লক্ষ লক্ষ মানুষ “আরবাঈন” (৪০ দিন পর) পর্যন্ত হেঁটে পায়ে হুসাইনের দরবারে পৌঁছায়। শোক যাত্রা, খাবার বিতরণ (নজর-নিয়াজ), মাতম, ধর্মীয় আলোচনা হয়।
উদাহরণ:প্রতিবার আশুরায় প্রায় ২-৩ কোটি মুসলমান কারবালায় জড়ো হন। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড়বাৎসরিক ধর্মীয় জমায়েতগুলোর একটি।

৪. পাকিস্তান:
সুন্নি-শিয়া উভয় সম্প্রদায় আছে। শিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী আশুরা পালন আছে। শহরের রাস্তায় তাজিয়া মিছিল, জঞ্জির মাতম, কারবালার নাট্য উপস্থাপনা হয়। সুন্নিরা রোযা রাখে, ইবাদত করে, কারবালার ঘটনা স্মরণ করে। সরকার বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়।
উদাহরণ:করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদে আলাদা আলাদা শিয়া এলাকা থেকে তাজিয়া বের হয়। সরকার তাদের জন্য রুট নির্ধারণ করে দেয়।

৫. ভারত:
মুসলমানদের মধ্যে শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায় প্রচুর। লখনৌ, হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, কলকাতা ও দিল্লি শহরে বড় বড় শোক মিছিল হয়। তাজিয়া, আলম বের হয়। হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে নাট্য উপস্থাপন, আলোচনা হয়। সুন্নিরাও আশুরা উপলক্ষে রোযা রাখে ও ইবাদত করে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ:মুঘল আমলে আশুরা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হতো। বাদশাহ নিজেও মাজলিসে যোগ দিতেন।

৬. বাংলাদেশ:
সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও শিয়া সম্প্রদায় ছোট পরিসরে আশুরা পালন করে। ঢাকার হোসেনি দালান আশুরা পালন ও শোক মিছিলে কেন্দ্রবিন্দু। প্রতীকীভাবে তাজিয়া মিছিল বের হয়, “হায় হুসাইন!” ধ্বনি তোলা হয়। অনেক সুন্নি আশুরা উপলক্ষে রোযা রাখেন, কোরআন খতম দেন।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ:হোসেনি দালান নির্মাণ করেছিলেন মুঘল আমলের শিয়া কর্মকর্তা। এটি শত শত বছর ধরে আশুরার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৭. লেবানন:
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিজবুল্লাহ-এর প্রভাব রয়েছে। আশুরার দিনে আর্মড শোক মিছিল, ধর্মীয় বক্তৃতা, প্রতীকী যুদ্ধ প্রদর্শন হয়। হুসাইনের আত্মত্যাগকে আধুনিক রাজনীতি ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
উদাহরণ:আশুরার ভাষণে বলা হয়: “প্রত্যেক যুগে ইয়াজিদ আছে, এবং হুসাইনের আত্মত্যাগ আজও প্রাসঙ্গিক।”

৮. তুরস্ক:
বেশিরভাগ সুন্নি হানাফি মুসলমান। আশুরার দিনে রোযা রাখা, বিশেষ দোয়া করা প্রচলিত। আশুরা পুডিং (Asure) তৈরি করে বিতরণ করা হয়।
ঐতিহ্য:তুর্কিরা বিশ্বাস করে এই দিনে নূহ (আ.) নৌকা থেকে নেমে যা যা পেয়েছিলেন তা দিয়ে এই পুডিং তৈরি করেছিলেন।

৯. আফগানিস্তান:
শিয়া হাজারা সম্প্রদায় আশুরা ঘটা করে পালন করে। আত্মত্যাগ, শোক, নাট্য রূপদান, আলম, তাজিয়া দেখা যায়। তালিবান শাসনকালে এসব বন্ধ ছিল, তবে কিছু এলাকায় গোপনে চলত।

সারসংক্ষেপে বিভিন্ন দেশের আশুরা উদাহরণ:
দেশ -ধরন -প্রধান রীতি
সৌদি আরব- সুন্নি- রোযা, ইবাদত
ইরান- শিয়া- মাতম, নাটক, আলম
ইরাক- শিয়া- কারবালায় মিলন, শোক
পাকিস্তান- উভয়- তাজিয়া, শোক-মিছিল
ভারত- উভয়- তাজিয়া, নাট্য উপস্থাপন
বাংলাদেশ- সুন্নি প্রধান- রোযা, হোসেনি দালান
তুরস্ক- সুন্নি- আশুরা পুডিং, রোযা
লেবানন- শিয়া- রাজনৈতিক-ধর্মীয় শোক

বিভিন্ন ইসলামী মনীষী, আলেম, ইতিহাসবিদ এবং সুফি সাধকরা আশুরা নিয়ে গভীর মন্তব্য ও বিশ্লেষণ করেছেন। নিচে কিছু মহান ব্যক্তির মন্তব্য তুলে ধরা হলো:
১. মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন- “আশুরার রোজা রাখো। আমি আশা করি, আল্লাহ তা’আলা এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম)
২. ইমাম হুসাইন (রা.) বলেন – “আমি যুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং উম্মতের মধ্যে সংশোধন আনতে চাচ্ছি।”(তালাবুল ইস্লাহ ু কারবালার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা)
৩. ইমাম জয়নুল আবেদীন বলেন – “কারবালার দিন ছিল আমাদের জন্য দুঃখ, ব্যথা ও কান্নার দিন। এটা কোনো উৎসবের দিন নয়।”
৪. ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন -“যারা আশুরাকে আনন্দ-উৎসবে পরিণত করেছে, তারা ইসলামি চেতনা হারিয়েছে। আশুরা শোক ও আত্মসমালোচনার দিন।”
৫. ইবনে কাসির (রহ.) ইসলামি ইতিহাসবিদ- “কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক এক অধ্যায়। হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের অবিচল প্রতিবাদ।”
৬. শেখ সাদী (রহ.)- “হুসাইনের পথ হচ্ছে আল্লাহর পথে আত্মত্যাগের পথ। তিনি দেখিয়ে গেছেন, অন্যায়ের সাথে আপস নয়, বরং আত্মদান শ্রেয়।”
৭. মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)- “ইমাম হুসাইনের আন্দোলন ছিল একটি নৈতিক বিপ্লব। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী মূল্যবোধকে রক্ষা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ।”
৮. ড. আলী শরীয়তী (ইরানী চিন্তাবিদ)-“হুসাইন (রা.) কেবল একজন শহীদ নন; তিনি হলেন মানবতার মুক্তির প্রতীক, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরকালীন এক বাণী হয়ে আছেন।”
৯. মাওলানা রুমী (রহ.)- “হুসাইনের রক্ত আমাদের আত্মার রঙ। তিনি ছিলেন প্রেমের শহীদ, যে প্রেম আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত।”
১০. খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)- “যদি আমি কারবালার সময়ে থাকতাম, তবে হুসাইনের পাশে থেকে জান দিয়ে দিতাম।”

আধুনিক সময়ের চিন্তাবিদরা:

১. আল্লামা ইকবাল বলেন – “ইসলামের বাস্তব শিক্ষা পুনর্জাগরণের জন্য হুসাইনের কারবালা আজও প্রেরণা।”
২. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র (উদ্ধৃত হয়েছে বিভিন্ন লেখায়)- “ইমাম হুসাইন ও তাঁর অনুসারীরা যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা মানবিক ন্যায়বোধের জন্য এক মহৎ উদাহরণ।”

আশুরা হলো ইতিহাসের এক বিশাল শিক্ষণীয় দিন। নবীদের জীবনের ঘটনাবলিতে ঈমান ও তাওবার উদাহরণ আমরা পেয়ে থাকি। কারবালার ঘটনার মাধ্যমে আমরা শিখি সাহসিকতা, সত্যবাদিতা ও আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা। আশুরা শুধু ইতিহাস নয়, এটি আত্মত্যাগের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ধ্বনি, ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ও বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ঐক্যের অনুপম নজির।আশুরা শুধু শোকের দিন নয়; এটি স্মরণ, শিক্ষা ও সচেতনতামূলক দিন। এই দিনে আমরা— অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই, আত্মশুদ্ধি করি, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকি।

লেখক:- এ্যাড. এস. ই. ইসলাম
চেয়ারম্যান:- বাংলাদেশ “ল” ফাউন্ডেশন এন্ড জুরিষ্টস
আজীবন সদস্য:- ঢাকা ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশন।
আইন উপদেষ্টা:- মানবাধিকার খবর।
বিশেষ প্রতিনিধি:- বাংলাদেশ আমেরিকান প্রেস সার্ভিস।
উপদেষ্টা:- নতুন অর্থনীতি,বহু গ্রন্থের লেখক ও কলামিষ্ট।