
অপরাধ প্রতিবেদক : ফ্যাসিবাদি সময়ে দেশে যেন দুর্নীতির মচ্ছবে মেতে ছিল ডায়নামিক সলিউশনস ইনোভেটরস (ডিএসআই) নামের একটি সফটওয়্যার কোম্পানি।
ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার নানা প্রকল্প বাগিয়ে নেয়ার পরও সেসব প্রকল্পের অধিকাংশেরই কাঙ্খিত অগ্রগতি হয়নি বা বাস্তবায়ন করা হতো না। যেখানে একের পর এক উঠছে দুর্নীতি, নিম্নমানের প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ।
সরকারি অর্থে পরিচালিত এসব প্রকল্প ঠিকঠাক বাস্তবায়ন না করা, জনসেবা না পৌঁছানো এবং ব্যাপক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর নতুন বাংলাদেশে ভোল পাল্টে আবার দুর্নীতির বলয় তৈরি করছে এই কোম্পানিটি।
সিআরভিএস প্রকল্প: ব্যর্থতা আর দুর্নীতির ছাপ:
নাগরিকদের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, তালাকের তথ্য ডিজিটাল করতে ২০১৪ সালে শুরু হয় সিআরভিএস (সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস) প্রকল্প। কক্সবাজার, জামালপুর ও গাইবান্ধায় পরীক্ষামূলকভাবে ওপেন সিআরভিএস চালু হলেও ২০২২ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে সারাদেশে আর রোলআউট করা সম্ভব হয়নি।
এই প্রকল্পটিতে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, কোটি কোটি টাকা খরচের পরও তা সীমিত বাস্তবায়ন ও স্কেলআপ হয়নি। ২০২২ সালে প্রকল্প মেয়াদ শেষ হলেও এখনও তা জাতীয় পর্যায়ে রোলআউট হয়নি, যেখানে ৪৭ কোটি টাকা হতে শুরু হয়ে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচের কথা বলা হচ্ছে।
সিআরভিএস তথ্য এখনও দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে কাগজে-কলমে বা বিচ্ছিন্ন সফটওয়ারে পরিচালিত হয়। এতে দুর্নীতি ও পক্ষপাতমূলক চুক্তি করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কোম্পানিটি নিম্নমানের সফটওয়্যার, প্রযুক্তি, অযৌক্তিক সফটওয়্যারের বিলিং ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম করেছে বলে জোর অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি ও সফটওয়্যারের দুর্বলতা নিয়ে মূল্যায়ন ও অডিট হলেও তদন্ত রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি।
অপ্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার বা ল্যাপটপ কেনার নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ের রেজিস্টারদের সফটওয়্যার যথাযথ প্রশিক্ষণ না করে সেই অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তারা।
আইইআইএমএস প্রকল্প, শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল প্রোফাইল কাগজে কলমে :
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক আইডি (ইউআইডি) ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালে নেয়া হয় ইন্টিগ্রেটেড এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (আইইআইএমএস) প্রকল্প।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল—৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করে তাদের শিক্ষা, ভর্তির ইতিহাস, পরীক্ষার ফলাফল ও উপস্থিতি একক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা। প্রকল্পের সময়সীমা ছিল জুলাই ২০১৮ হতে জুন ২০২২ পর্যন্ত। যার বাজেট ছিল প্রায় ২৩ কোটি টাকার মতো।
ডিএসআই এই প্রকল্প যোগসাজশে হাতিয়ে নিয়েছে। কোম্পানিটি জাতীয় পর্যায়ে এর রোলআউট করেনি এবং এর কোনও লাইভ পাবলিক পোর্টাল চালু নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ৪ বছর আগে শেষ হলেও এখনো সিস্টেম চালু হয়নি। শুধু কিছু শিক্ষা বোর্ডে ও জেলা পর্যায়ে ইউআইডি তৈরির কাজ আংশিক সম্পন্ন করেছে মাত্র।
সরকারি তদন্ত ও বেশ কিছু রিপোর্টে দেখা গেছে—প্রকল্পে ব্যবহৃত সফটওয়্যার ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও অবকাঠামো যা তথ্য সংরক্ষণে সক্ষম নয়।
সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার কেনাকাটায় মূল্যফাঁকি, অপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় এবং একই কাজের জন্য একাধিক পেমেন্ট এর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
ডিএসআই সরাসরি অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কাজ পেয়েছে — এমন অভিযোগও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে উঠে এসেছে।
প্রকল্পের কার্যক্রম বারবার ডেডলাইন পেছানো হয়—যা অদক্ষতা ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সফটওয়্যার ভেন্ডর নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে এটি শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিসিআইসি অটোমেশন, সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে সিন্ডিকেট:
সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ূন ও বিসিআইসি (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন) কিছু অসৎ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ডিএসআই বিসিআইসির ইন্টিগ্রেটেড বিজনেস প্রসেস অটোমেশন প্লাটফর্ম প্রকল্পটি হাতিয়ে নেয়।
দীপন গ্রুপের সাথে যোগসাজশ করে ডিএসআই। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদের প্রকাশ্য আনুকূল্যে দীপন গ্রুপ সরাসরি লেনদেন করতো বলে অভিযোগ আছে।
সাবেক মন্ত্রীর ঠিকাদারি পছন্দ ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে দীপন গ্রুপের সাথে মিলেমিশে তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন, সেই দীপন গংদের সাথে ডিএসআই এর জড়িত থাকার সরাসরি অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার প্রকল্পেও দুর্নীতি:
আইপিইএমআইএস (ইন্টিগ্রেটেড প্রাইমারি এডুকেশন এমআইএস) প্রকল্পেও ডিএসআইয়ের দুর্নীতির অভিযোগ স্পষ্ট।
ইউনিসেফ ও এডিবির অর্থায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পটিতে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা ও ডিএসআইয়ের বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ আছে। এটিও পুরোপুরি চালু হয়নি।
এটুআইয়েও ডিএসআইয়ের থাবা:
এটুআইয়ের আওতায় পরিচালিত আইএসডিপি (ইন্টিগ্রেটেড সার্ভিস ডেলিভারি প্লাটফর্ম) প্রকল্পটিকে ব্যর্থ করেছে ডিএসআই। যেখানে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
ঘুষ আর যোগসাজশের ওস্তাদ আসাদুল্লাহ:
ডিএসআইয়ের কর্মকর্তা সরকারের এসব কাজ পেতে এই ঘুষ ও যোগসাজশের কাজটি করেন। সরকারের অনেক দপ্তরেও তাকে এই পরিচয়েই বেশি চেনে সবাই।
বিসিআইসিতে আবারও ডিএসআইয়ের যোগসাজশ :
সম্প্রতি দেশে সারের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং মজুদ থেকে ডিলার পর্যন্ত সারের সকল তথ্য অনলাইনে নিয়ে আসতে ‘অনলাইন বেইজড ফার্টিলাইজার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ নামক একটি টেন্ডারেও ইতোমধ্যে উঠেছে যোগসাজশের অভিযোগ।
প্রশ্ন উঠেছে বারবার ব্যর্থতা, বারবার দুর্নীতির অভিযোগের পরও কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি পার পেয়ে যাচ্ছে। কেন তদন্ত রিপোর্ট গোপন রাখা হয়? কেন কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয় না?
জোর দাবি উঠেছে, ডিএসআই সম্পর্কিত সব প্রকল্পের স্বাধীন তদন্ত ও অডিট রিপোর্ট প্রকাশের। এখানে দুর্নীতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও কালো তালিকাভুক্তির।
অপরাধ প্রতিবেদক 









