
== মোয়াজ্জেম হোসেন==
আল জাহের সৌদি আরবের মক্কা হারাম শরিফের ৩ কি.মি, দূরে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকা আল-জাহের। বন্ধু পারভেজ ইসলাম মানিকের ওয়াশ ফ্যাক্টরি কাম বাসস্থান। মূলত বন্ধু মানিকের সাথে আমাদের মৌখিক চুক্তি, আমরা বাংলাদেশের দুই গরিব আদমি আমি ও আনোয়ার ভাই ভিসা ও টিকেট নিয়ে কোনোরকমে জেদ্দা বিমানবন্দরে পৌঁছা, বাকী সব দায়িত্ব- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ওমরা পালন, ট্রান্সপোর্ট, পরিদর্শন (জিয়ারা) সবকিছু দায়-মানিক ও হজ, ওমরা, রিক্রুটিং ও ট্রাভেলস ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ইউনুছ ভাইয়ের ওপর। সেই অলিখিত চুক্তির অংশ হিসেবে আমাদের জেদ্দা এয়ার পোর্ট থেকে উদ্ধার করার পর জেদ্দা থেকে মক্কায় ওমরার উদ্দেশ্যে হারাম শরিফে পৌঁছে দেওয়া, পথিমধ্যে নাস্তা খাওয়ানো এরপর পবিত্র কাবা ঘরের মালিকের কাছে হাজির করিয়ে ওমরা সংশ্লিষ্ট তাওয়াফ, সায়ী ও মাথা মুন্ডন সম্পন্ন করার পর মানিকের মহিমান্বিত আস্তানা আল জাহের এর পথে রওনা করি। প্রায় ২০ কাঠা জায়গার উপর বিশাল ওয়াশ ফ্যাক্টরির সাথে থাকার ঘর। আরবিতে যাকে বলে মারকাজিয়া মাখছালা অর্থাৎ বড়ো ধরনের ধোলাই ঘর। তবে ওয়াশ ফ্যাক্টরিটি নন ইন্ডাস্ট্রিয়াল।
আমাদের সম্মানে রুম ও আশে পাশে রঙ, পালিশ ও চুনকাম করা হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে যেদিকে হাত লাগায় রঙের ছোঁয়া ও ষ্পর্শ পেয়েছি, একবারে টাটকা রঙ, একবার লাগলে সহজে আর ছাড়তে চায় না। এমনকি অসমাপ্ত কাজ শেষ করার কসরত নিজ চোখে দেখেছি। বন্ধুর জন্য আর কীই বা করার আছে !
দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে আমরা ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হলেও এত আয়োজন দেখে যথেষ্ট সম্মানিত বোধ করছি। গোসল শেষে পরিচ্ছন্ন হয়ে এবার রাতের খাওয়া। মানিক খুব আন্তরিকতার সাথে নিজ হাতে রান্না করেছে। বাসমতি চালের ভাত, গরু ভূনা, মুরগীসহ আয়োজনের কমতি নেই। মাল্টা, আপেল কাটা হচ্ছে অবিরাম, সাথে স্বাস্থ্যের জন্য অতি উপকারী! এনার্জি ড্রিংক ভিরা (এই উপকারি মাল আমাদের ঔষধ জ্ঞানে নাক মুখ চেঁপে ধরে খেতে হয়েছে) খাওয়া শেষ হলেও ঘুমানোর কোন জো নেই, দীর্ঘদিনের জমানো কথা কিছুটা হলেও শেষ করতে হবে। রাত কত হলো তা দেখার জো নেই, আড্ডা চলমান।
আল জাহের মূলত মক্কা জেদ্দা পুরাতন রোডে সিত্তিন ইশারা সংলগ্ন মরুময় আরবের রুক্ষ সুক্ষ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকা। অল্প কিছু প্রবাসী থাকলে সৌদি বাসিন্দাদের বসবাসের জায়গা। মহাসড়ক ও রাস্তার পাশে কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও দোকান পাট থাকলেও বাকী সব বসত বাড়ি, বেশির ভাগ ৪/৫ তলা বিল্ডিং। হাইরাইজ বিল্ডিং নাই বললেই চলে। অধিকাংশ সৌদি নাগরিক সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবি, অন্যরা বাড়িওয়ালা বা মার্কেটের মালিক। বেশির ভাগ সৌদি নাগরিকের একের অধিক বাড়ি এবং একের অধিক স্ত্রী থাকে। এমন কথাও প্রচলিত আছে -পণ দেওয়ার সামর্থ নেই, তাই ইচ্ছে মতো বিয়ে করতে পারছে না! উপযুক্ত মোহরানা দিয়ে নিজের মেয়ে বিয়ে দিয়ে, সেই টাকা দিয়ে নিজে বিয়ে করে। আবার অনেক সৌদি যুবক আছে মোহরানার টাকার অভাবে বিয়ে করতে পারছে না। ঠিক এই প্রভাবটি পরে মেয়েদের ওপর- মেয়ে আইবুড়ো হয়ে যাচ্ছে, বিয়ের যোগ্য পাত্র পাচ্ছে না।
আল জাহেরে রয়েছে প্রাসাদ জাদুঘর। যা সৌদি আরবের ঐতিহাসিক জাদুঘর, মক্কার ইতিহাস এবং এই অঞ্চলের ইসলামি ইতিহাসের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষক। বর্তমানে তা মক্কা জাদুঘর নামে পরিচিত।
আল জাহেরে আরো রয়েছে বিশ্বখ্যাত উম্মুলকোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা ক্যাম্পাস, কিং আবদুল আজিজ সরকারি হাসপাতাল, মক্কা পাসপোর্ট অফিস, মক্কা লেবার অফিস ও মক্কা প্রতিবন্ধী হাসপাতাল। আপনি প্রবাসী বা সৌদি নাগরিক যাই হোন না কেন, ইচ্ছাই হোক বা অনিচ্ছাই হোক পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রয়োজনে আপনাকে অবশ্যই আল জাহের আসতে হবে।
একটি ওয়াশ ফ্যাক্টরিতে যা যা থাকা প্রয়োজন এখানে সবই আছে। শেডের মধ্যে রয়েছে একাধিক ওয়াশিং মেশিন, ড্রায়ার, আইরন, কার্পেট ওয়াশের পৃথক মেশিনসহ বেশ কয়েকটি লন্ডির শোরুমের মেশিনারিজ, ফার্নিচার, বিভিন্ন ধরনের ওয়াশিং কেমিক্যালের ড্রাম ও ওয়াশিং পাউডারের স্তুপ। এছাড়াও রয়েছে বাসাবাড়ির বিভিন্ন ফার্নিচার। আর ফ্যাক্টরিতে ওয়াশের জন্য আসা অথবা ওয়াশ হয়ে থাকা পর্দা, টাওয়েল, কম্বল ও কার্পেটের স্তুপ। মানিকের আরেকটি অভ্যাস সময় সুযোগ পেলে সে ঘুরতে যায় ব্যবহৃত ও পুরনো জিনিসের ওপেন মার্কেট হারাজে। যেখানে পাওয়া যায় না এমন কোন জিনিস নেই—গৃহস্থালি মালামাল থেকে শুরু করে মেশিনারিজ, গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ফার্নিচার ও গৃহনির্মাণ সামগ্রী ইত্যাদি। মানিকের সাথে আমাদেরও হারাজে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ঔ মার্কেটে ঘুরতে গিয়ে মানিকের ব্যবসা সংশ্লিষ্ট যখন কোন মেশিনারিজ পছন্দ হয় তখন তা হাতছাড়া করে না। সে রকম সংগৃহীত অনেক যন্ত্রপাতিও ফ্যাক্টরিতে ঠাসা। আর এই কম্পাউন্ডের মধ্যে রয়েছে একটি কুয়া, আরবি যাকে বলে বির। যা ওয়াশিং ফ্যাক্টরির জন্য অপরিহার্য। এই কুয়াগুলো পানির প্রাকৃতিক উৎস। যদিও কুয়াটি সৌদি মালিকের অধীনে, তবে মানিক ভাড়াটিয়া হিসেবে ফ্রি পানি পেয়ে থাকে।
মক্কা অবস্থানকালীন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গেল সকালে ঘুম থেকে ওঠে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন বিকালে হারাম শরিফে নামাজ, তাওয়াফ ও নিবিষ্ট মনে ইবাদত বন্দেগি করে সময় কাটানো। আমাদের এই রুটিনে বেশির ভাগ সময়ে গাইড, আমির এবং ড্রাইভিং সিটে ইউনুছ ভাই অবধারিত। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি দীর্ঘদিন হাজিদের সেবা দেওয়ার কারণে প্রত্যেকটি দর্শনীয় স্থানের ইতিহাস, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সম্পর্কে উনার জ্ঞান রাস্তা সম্পর্কে ধারণা ঈর্ষনীয় পর্যায়ের।
আল জাহের থেকে ইউনুছ ভাই ও মানিকের নেতৃত্বে জেদ্দা, তায়েফ, হুদায়বিয়া, জাবালে নুর, জাবালে সুর, আরাফা, মিনা, মুজদালিফা, জান্নাতুল মুয়াল্লা, জিন মসজিদ, উম্মে মায়মুনা রা. কবর, মক্কা হারাজ, সরাইয়া এবং সর্বশেষ বদর প্রান্তর হয়ে নবির শহর মদিনায়। মদিনায় নবি সা. এর রওজায় সালাম দিয়ে ওহুদ, খন্দকের প্রান্তর ছুঁয়ে অন্যান্য ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানসমুহ পরিদর্শন শেষে আবার নির্ধারিত ঠিকানা আল জাহেরে। তেমনি আল জাহের থেকে আছির প্রদেশের মাহাইল, আবহা ও আল সৌদায় কয়েকদিন ঘুরে আবার আল জাহের। আমরা দেশ থেকে যাওয়ার সময় যে বাক্স পেটরা নিয়ে মানিকের আস্তানায় ওঠেছি, ওখান থেকে আর নামানামি নাই, পরিকল্পনা মাফিক ইবাদত, ভ্রমণ ও পরিদর্শন সব শেষ করে তারপর তাদের ছুটি। তাদের প্রবাসের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার মধ্যে মক্কায় অবস্থানকালীন দিনগুলোতে প্রতিদিন কোনো না কোনো স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ম করে হারাম শরিফে পৌঁছে দেওয়া আবার নিয়ে আসার মতো কঠিন ডিউটি তাদের প্রতিদিন করতে হয়েছে। আমাদের সৌদি আবরে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ওমরা আদায় করা। আমাদের স্রেফ নফল ইবাদত পালনকে কেন্দ্র করে তাদের উপর প্রায় মাসব্যাপী যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছি এবং চরম বিরক্ত করেছি, তা চরম অবিবেচকের মতো কাজ হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর ২৪ আমরা জেদ্দা বিমান বন্দর থেকে তাদের ঘাড়ের উপর উঠেছি এবং ১৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে পুনরায় জেদ্দা বিমান বন্দরে তাদের শক্ত, সামর্থ ও প্রশস্ত ঘাড় থেকে নেমে স্বদেশের বিমানে উঠেছি। তারা যে আমাদের এতদিন সহ্য করেছেন এবং আমাদের পেছনে তাদের যে অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় হয়েছে তার বিনিময়ে তাদের ইহকালীন সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও পরকালীন মুক্তি কামনা করছি।
মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রাবন্ধিক ও গবেষক 









