০২:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ‘স্পা সেন্টার’-এর আড়ালে জামান গ্রুপের দৌরাত্ম্য

অপরাধ প্রতিবেদক : ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকা বনানীতে গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ‘স্পা সেন্টার’-এর আড়ালে গড়ে ওঠেছে এক ভয়ংকর অনৈতিক সাম্রাজ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই আজ কেবল বিউটি কেয়ার নয়, রূপ নিয়েছে অবৈধ দেহব্যবসা, মাদক সেবন এবং অর্থপাচারের ঘাঁটিতে। এরই মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছে জামান গ্রুপ যারা নিজেদের ‘ওয়েলনেস হাউস’ কিংবা ‘হোলিস্টিক হিলিং সেন্টার’ বলে দাবি করলেও, বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বনানীর ১১ নম্বর সড়ক থেকে শুরু করে গুলশান ও বারিধারার আশপাশে জামান গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে আছে অন্তত ৭টি স্পা সেন্টার। এদের দৌরাত্ম্যে উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী, অথচ প্রশাসন নিরব, এমনকি তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও উঠেছে।

জামান গ্রুপের অন্তর্গত ‘সেরিনিটি স্পা’, ‘বডি ব্লিস থেরাপি’, ‘জেন স্কিন ক্লিনিক’সহ একাধিক নামি-দামি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত চলে ‘ভিআইপি সেবা’। তদন্তে জানা গেছে, রাত ৮টার পর এসব স্পা সেন্টার পরিণত হয় এক ধরনের ‘প্রাইভেট ক্লাবে’, যেখানে অতিথিদের জন্য রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থাপনা। ভেতরে ঢুকতে হয় নির্দিষ্ট কোডওয়ার্ড ব্যবহার করে। সেখানে শুধু ম্যাসাজ নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে চলে অনৈতিক সম্পর্কের সুযোগ, মাদকদ্রব্য সরবরাহ ও অর্থ লেনদেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই চক্রে নিয়োজিত বেশ কিছু বিদেশি নারী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এনে প্রশিক্ষিত নারী কর্মী রয়েছেন, যাদের ব্যবহার করা হয় ‘থেরাপিস্ট’ পরিচয়ে। অনেক তরুণী প্রথমে চাকরির প্রলোভনে এখানে যুক্ত হলেও পরে বেরিয়ে আসতে পারেন না নানা হুমকি-ধামকির কারণে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় পরিসরে জামান গ্রুপ কীভাবে এতগুলো স্পা পরিচালনা করছে তা-ও বনানীর মত স্পর্শকাতর এলাকায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটির সাথে বনানী থানার কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য এবং সিটি কর্পোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত। প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ‘ম্যানেজমেন্ট খরচ’ হিসেবেই জামান গ্রুপ এসব প্রভাবশালী মহলে টাকা পৌঁছে দেয়। এতে কেউই ‘ভেতরের ঘটনা’ দেখেও দেখে না।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই জামান গ্রুপের ওপর নজর রাখছে, তবে কোনো শক্ত পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি। এমনকি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একবার ‘বডি ব্লিস থেরাপি’তে অভিযান চালালেও, সেখানে অপ্রস্তুত কিছু কর্মী ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের আগে আগেই সব প্রমাণ সরিয়ে ফেলা হয় এবং ভেতরের তথ্য ‘লিক’ করে দেয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ।

জামান গ্রুপের মূল চালিকাশক্তি একজন সাবেক বিউটি এক্সপার্ট, যিনি মিডিয়া জগতেও পরিচিত ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগীর মতে, “তিনি শুরুতে প্রকৃত ম্যাসাজ থেরাপি চালু করলেও পরে ‘হাই-প্রোফাইল’ ক্লায়েন্টদের চাহিদা মেটাতে ধীরে ধীরে অবৈধ পথে হাঁটেন। এখন তার রয়েছে প্রাইভেট কার, দামী অ্যাপার্টমেন্ট ও প্রভাবশালী মহলে ওঠা-বসার সুযোগ।”

জানা গেছে, কর্ণধারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে একাধিক রাজনীতিবিদ, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। মাঝে মধ্যেই বনানীর অভিজাত রেস্টুরেন্টে তাকে দেখা যায় প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে ডিনারে। এ থেকেই বোঝা যায়, তার ছায়াতলে থাকা শক্তি কতটা ভয়ংকর।

জামান গ্রুপের স্পা ব্যবসা শুধু বনানী নয়, ঢাকার অন্যান্য এলাকাতেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিমাসে শুধু স্পা থেকে ৮০-৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয় বলে জানিয়েছেন এক প্রাক্তন কর্মী। এই টাকা মূলত চলে যায় কর্ণধার ও তার সঙ্গীদের অ্যাকাউন্টে, কিছু অংশ নগদ হারে ছড়িয়ে পড়ে প্রশাসনিক দফতর ও ‘সিকিউরিটি পার্টনারদের’ মাঝে।

অভিযোগ রয়েছে, এই গ্রুপটি বিভিন্ন অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা পাচার করে থাকে। এমনকি মালয়েশিয়া, দুবাই ও থাইল্যান্ডে একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

এই চক্রে নিযুক্ত বহু তরুণী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। একজন কর্মী বলেন, “প্রথমে বলা হয়েছিল পার্ট-টাইম চাকরি, পরে যখন জানতে পারলাম কি করতে হচ্ছে, তখন চুপচাপ মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি। যারা আপত্তি করে, তাদের হুমকি দেয়া হয়, এমনকি ভিডিও ধারণ করে

অন্যদিকে এলাকাবাসীও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বনানী ১১ নম্বর রোডের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “রাত-বিরাতে স্পা থেকে বের হওয়া মানুষজনের আচরণ সন্দেহজনক। অনেকেই গাড়ির ভেতরে বসে মদ খায়। তবুও আমরা কিছু করতে পারি না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসন চাইলেই জামান গ্রুপের মত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক প্রলোভনের কারণে তা হয় না। স্বচ্ছ তদন্ত ও নিরপেক্ষ অভিযান চালাতে পারলে এই চক্রের মুখোশ উন্মোচন সম্ভব। একজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, “এই ধরণের স্পা সেন্টার রাজধানীর নৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এসব জায়গা শুধুমাত্র অবৈধ উপার্জনের কেন্দ্র নয়, এখানে মাদক, নারী পাচার এমনকি সন্ত্রাসীদেরও যোগাযোগ গড়ে উঠছে।”

ট্যাগ:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক তথ্য সম্পর্কে

ছয় দিন ধরে বন্ধ চার চা বাগান, ডিসির কাছে শ্রমিকদের স্মারকলিপি

রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ‘স্পা সেন্টার’-এর আড়ালে জামান গ্রুপের দৌরাত্ম্য

আপডেটের সময় : ০৯:৪৬:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫

অপরাধ প্রতিবেদক : ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকা বনানীতে গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ‘স্পা সেন্টার’-এর আড়ালে গড়ে ওঠেছে এক ভয়ংকর অনৈতিক সাম্রাজ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই আজ কেবল বিউটি কেয়ার নয়, রূপ নিয়েছে অবৈধ দেহব্যবসা, মাদক সেবন এবং অর্থপাচারের ঘাঁটিতে। এরই মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছে জামান গ্রুপ যারা নিজেদের ‘ওয়েলনেস হাউস’ কিংবা ‘হোলিস্টিক হিলিং সেন্টার’ বলে দাবি করলেও, বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বনানীর ১১ নম্বর সড়ক থেকে শুরু করে গুলশান ও বারিধারার আশপাশে জামান গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে আছে অন্তত ৭টি স্পা সেন্টার। এদের দৌরাত্ম্যে উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী, অথচ প্রশাসন নিরব, এমনকি তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও উঠেছে।

জামান গ্রুপের অন্তর্গত ‘সেরিনিটি স্পা’, ‘বডি ব্লিস থেরাপি’, ‘জেন স্কিন ক্লিনিক’সহ একাধিক নামি-দামি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত চলে ‘ভিআইপি সেবা’। তদন্তে জানা গেছে, রাত ৮টার পর এসব স্পা সেন্টার পরিণত হয় এক ধরনের ‘প্রাইভেট ক্লাবে’, যেখানে অতিথিদের জন্য রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থাপনা। ভেতরে ঢুকতে হয় নির্দিষ্ট কোডওয়ার্ড ব্যবহার করে। সেখানে শুধু ম্যাসাজ নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে চলে অনৈতিক সম্পর্কের সুযোগ, মাদকদ্রব্য সরবরাহ ও অর্থ লেনদেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই চক্রে নিয়োজিত বেশ কিছু বিদেশি নারী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এনে প্রশিক্ষিত নারী কর্মী রয়েছেন, যাদের ব্যবহার করা হয় ‘থেরাপিস্ট’ পরিচয়ে। অনেক তরুণী প্রথমে চাকরির প্রলোভনে এখানে যুক্ত হলেও পরে বেরিয়ে আসতে পারেন না নানা হুমকি-ধামকির কারণে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় পরিসরে জামান গ্রুপ কীভাবে এতগুলো স্পা পরিচালনা করছে তা-ও বনানীর মত স্পর্শকাতর এলাকায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটির সাথে বনানী থানার কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য এবং সিটি কর্পোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত। প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ‘ম্যানেজমেন্ট খরচ’ হিসেবেই জামান গ্রুপ এসব প্রভাবশালী মহলে টাকা পৌঁছে দেয়। এতে কেউই ‘ভেতরের ঘটনা’ দেখেও দেখে না।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই জামান গ্রুপের ওপর নজর রাখছে, তবে কোনো শক্ত পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি। এমনকি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একবার ‘বডি ব্লিস থেরাপি’তে অভিযান চালালেও, সেখানে অপ্রস্তুত কিছু কর্মী ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের আগে আগেই সব প্রমাণ সরিয়ে ফেলা হয় এবং ভেতরের তথ্য ‘লিক’ করে দেয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ।

জামান গ্রুপের মূল চালিকাশক্তি একজন সাবেক বিউটি এক্সপার্ট, যিনি মিডিয়া জগতেও পরিচিত ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগীর মতে, “তিনি শুরুতে প্রকৃত ম্যাসাজ থেরাপি চালু করলেও পরে ‘হাই-প্রোফাইল’ ক্লায়েন্টদের চাহিদা মেটাতে ধীরে ধীরে অবৈধ পথে হাঁটেন। এখন তার রয়েছে প্রাইভেট কার, দামী অ্যাপার্টমেন্ট ও প্রভাবশালী মহলে ওঠা-বসার সুযোগ।”

জানা গেছে, কর্ণধারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে একাধিক রাজনীতিবিদ, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। মাঝে মধ্যেই বনানীর অভিজাত রেস্টুরেন্টে তাকে দেখা যায় প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে ডিনারে। এ থেকেই বোঝা যায়, তার ছায়াতলে থাকা শক্তি কতটা ভয়ংকর।

জামান গ্রুপের স্পা ব্যবসা শুধু বনানী নয়, ঢাকার অন্যান্য এলাকাতেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিমাসে শুধু স্পা থেকে ৮০-৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয় বলে জানিয়েছেন এক প্রাক্তন কর্মী। এই টাকা মূলত চলে যায় কর্ণধার ও তার সঙ্গীদের অ্যাকাউন্টে, কিছু অংশ নগদ হারে ছড়িয়ে পড়ে প্রশাসনিক দফতর ও ‘সিকিউরিটি পার্টনারদের’ মাঝে।

অভিযোগ রয়েছে, এই গ্রুপটি বিভিন্ন অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা পাচার করে থাকে। এমনকি মালয়েশিয়া, দুবাই ও থাইল্যান্ডে একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

এই চক্রে নিযুক্ত বহু তরুণী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। একজন কর্মী বলেন, “প্রথমে বলা হয়েছিল পার্ট-টাইম চাকরি, পরে যখন জানতে পারলাম কি করতে হচ্ছে, তখন চুপচাপ মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি। যারা আপত্তি করে, তাদের হুমকি দেয়া হয়, এমনকি ভিডিও ধারণ করে

অন্যদিকে এলাকাবাসীও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বনানী ১১ নম্বর রোডের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “রাত-বিরাতে স্পা থেকে বের হওয়া মানুষজনের আচরণ সন্দেহজনক। অনেকেই গাড়ির ভেতরে বসে মদ খায়। তবুও আমরা কিছু করতে পারি না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসন চাইলেই জামান গ্রুপের মত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক প্রলোভনের কারণে তা হয় না। স্বচ্ছ তদন্ত ও নিরপেক্ষ অভিযান চালাতে পারলে এই চক্রের মুখোশ উন্মোচন সম্ভব। একজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, “এই ধরণের স্পা সেন্টার রাজধানীর নৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এসব জায়গা শুধুমাত্র অবৈধ উপার্জনের কেন্দ্র নয়, এখানে মাদক, নারী পাচার এমনকি সন্ত্রাসীদেরও যোগাযোগ গড়ে উঠছে।”