০১:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেট হতাশাপূর্ণ

  • এস, ই ইসলাম
  • আপডেটের সময় : ০১:৪৯:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫
  • ১২৮০ টাইম ভিউ

এস, ই ইসলাম

========================

অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ গত ২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যাহা বিপ্লবি সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক বলে তারা বিবেচনা করছেন। কিন্তু প্রত্যাশার বাজেট হতাশার বাজেটে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এই সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬: অবহেলিতরা কী পেয়েছে’ শীর্ষক বহুপক্ষীয় অংশীজন বৈঠকে এসব কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেট নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রত্যাশার বাজেট হতাশার বাজেটে পরিণত হয়েছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একটা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বাজেট প্রণয়নের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু বাজেটে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদে (ক্যাবিনেট) অনুমোদন ছাড়াই বাজেটটি এসেছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটকে সুযোগ হারানোর (মিস অপরচুনিটিস) বাজেট বলা যায়। বাজেটে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বেশ বড় একটা ফারাক দেখতে পাচ্ছি। মূল সমস্যাটা হলো, পুরোনো বাজেটের কাঠামোর মধ্যেই নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বাজেটে যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়।’

সেলিম রায়হান আরও বলেন, শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও রয়েছে। কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। সামাজিক সুরক্ষা খাতে কিছু পুনর্গঠন হয়েছে, কিন্তু খুব বড় ধরনের কোনো পুনর্গঠন দেখা যায়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের যে বরাদ্দ হয়েছে, এটাও অনেক কম। অথচ বাজেটে এবার একটা ভিন্ন কিছু করার সুযোগ ছিল।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত বাজেট হলো সুযোগ হারানোর বাজেট। তবে আমি বলব, এবারের বাজেট হচ্ছে “লস্ট অপরচুনিটি”। কিন্তু গতানুগতিক একটা বাজেট হওয়ায় আমরা দুর্বল হয়ে গেলাম।’

ফওজিয়া মোসলেম বাজেটকে সমৃদ্ধ করতে নারীর প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে:
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনটির সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। ঢাকা, ১৭ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেছেন, জাতীয় বাজেটকে সমৃদ্ধ করতে নারীর প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে। বাজেটের বরাদ্দ যদি ঠিক না থাকে তাহলে, কোনখানে বরাদ্দটা বেশি হতে হবে সেই গুরুত্বটা বোঝা যাবে না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনটির সভাপতি এসব কথা বলেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, ‘আমাদের সবার লক্ষ্যটা বাজেটে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই প্রতিফলনের ফলে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা দেখা।’

সমাজের অত্যন্ত গভীরে নারীর প্রতি বিদ্বেষ জমা হয়ে আছে উল্লেখ করে মহিলা পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘আমরা বলতেছি যে নারীর প্রতি বৈষম্য কমছে কিন্তু আমরা গত আটুনয় মাসে যেটা দেখলাম, সমাজের অত্যন্ত গভীরে নারীর প্রতি বিদ্বেষ জমা হয়ে আছে। যেটা বিস্ফোরণ ঘটল, এখনো চলছে।’

মহিলা পরিষদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী। তিনি বলেন, ২০২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বরাদ্দের তুলনায় ২০২৫ অর্থবছরে লিঙ্গ-সম্পর্কিত বরাদ্দ ৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৪ দশমিক ৯ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২০২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৬০ হাজার ৭৬৬ দশমিক ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন বলেন, জেন্ডার বাজেটিং আগে একসময় ছিল না, এখন এগুলো শুরু হয়েছে এবং সে ক্ষেত্রে মহিলা পরিষদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। একটা অস্থির পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই সরকার যাচ্ছে, সেটা সবাই জানে। এ কারণে খুব বেশি প্রত্যাশা করাটা হয়তো ঠিক হবে না।

সভার শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। বৈশ্বিক এবং জাতীয় পর্যায়ে অনেক নীতিমালা গৃহীত হয়েছে, অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে কিন্তু আমরা জানি যে সেখানে বিনিয়োগটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবায়ন পর্যায়ে এবারের জাতীয় বাজেটে কতটুকু ‘‘জেন্ডার সৃজনশীল প্রতিফলন’’ হয়েছে, সেটা আমরা আসলে দেখতে চাই।’

মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুনের সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সানেমের ডেপুটি ডিরেক্টর ইশরাত শারমিন, ইউএনডিপির জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক উম্মে মারজান, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, দলিত নারী ফোরামের প্রকল্প কর্মকর্তা তামান্না সিং বড়াইক প্রমুখ।

কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল হতে পারে

অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম বাজেট প্রস্তাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখলেও তা এখন বাতিল করতে পারে। ২২ জুন প্রস্তাবিত এ বাজেট পাস করা হবে। সেখানে কালোটাকা সাদা করার সুযোগটি নাুও রাখা হতে পারে।

দেশে আগে থেকেই আয়কর আইনের তফসিলের মাধ্যমে এত দিন কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত টাকায় ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করহার কয়েক গুণ বাড়িয়ে সুবিধাটি বহাল রাখার প্রস্তাব করেন। এর পর থেকেই তা নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা শুরু হয়। ফলে সরকার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেছে। সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব নেতাদের এক আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

অর্থ উপদেষ্টা ২ জুন নতুন বাজেট উপস্থাপন করেন। এতে তিনি অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট কেনার পাশাপাশি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখেন। তবে আগের চেয়ে করের পরিমাণ বাড়িয়েছেন তিনি। সে অনুযায়ী এলাকাভেদে আয়তন অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলেই টাকার উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, এমনটা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধরে নেবে বলে উল্লেখ করা হয়।

অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার ক্ষেত্রে দুটি শর্তও দেওয়া হয়। যদি আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনের অধীন কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে উদ্ভূত হয় এবং কোনো বৈধ উৎস থেকে উদ্ভূত না হয়, তাহলে কালোটাকা সাদা করা যাবে না।

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও পৌর এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ১০০ থেকে ২ হাজার টাকা কর প্রস্তাব করেন অর্থ উপদেষ্টা। এ ছাড়া একই সুবিধা পেতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ৫০ থেকে ৯০০ টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা এসে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বাতিল করেছিল। কিন্তু এই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা প্রথম বাজেটেই নতুন করে করহার বাড়িয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখার প্রস্তাব করেন।

সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের দেওয়া চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এক বছরের জন্য নগদ টাকার পাশাপাশি জমি, ফ্ল্যাট-প্লটসহ স্থাবর সম্পদ কেনার মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সর্বোচ্চ করহারের চেয়ে কম কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার এ সুবিধার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনা ছিল। এ সুযোগকে অনৈতিক ও সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক।

অবশেষে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কালোটাকা সাদা করার বিধান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু আয়কর আইনের তফসিলে রাখা কালোটাকা সাদা করার সুবিধা বহাল থাকে।

প্রায় সব সরকারের আমলেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর এ সুযোগ দেওয়া হলেও অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থসম্পদ বৈধ করায় কখনোই তেমন সাড়া মেলেনি।

এনবিআরের সূত্রগুলো বলছে, এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে অপ্রদর্শিত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঘোষণায় এসেছে, অর্থাৎ সাদা করা হয়েছে। বিএনপি সরকারের ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ ছিল না।

সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশ থেকে পাচার করা টাকা ফেরত আনার সুযোগ দেওয়া হলেও কেউ সুযোগটি নেননি। এর এক বছর পরই আবারও কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়।

টিআইবি (ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ইধহমষধফবংয) ২০২৫‑২৬ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে প্রধানত নিম্নলিখিত মন্তব্য করেছে:

১. কালো টাকা সাদা করার সুযোগের তীব্র বিরোধ বাজেটে “অপ্রদর্শিত আয়” বৈধ করার সুযোগ চালু রাখার প্রস্তাবে টিআইবি তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলছে এই পদক্ষেপ “অনৈতিক, বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী” ।

নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করছে, যা স্পষ্টভাবে বলে অনুপার্জিত আয় অবৈধ” ।

২. রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি দমন কর্মসূচির বিপর্যয়

বাজেটে এই সুযোগ রাখার ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার, উপেক্ষিত হচ্ছে ।

এতে বলা হয়েছে, “সরকার রিয়েল এস্টেট লবির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে” ও দুর্নীতিকে উৎসাহ দান করেছে ।

৩. ইদানীং অপ্রদর্শিত আয় ‘সাদা’ হওয়ার আশঙ্কা

টিআইবি সতর্ক করেছে যে, বাজেটে থাকা এই নিয়ম কালো টাকা উৎপাদনের প্রবণতা বাড়ানোর পাশাপাশি তা পরবর্তীতে বৈধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে ।

৪. দ্রুত ও স্থায়ী বাতিলের দাবি

তারা দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংশোধিত বাজেট বা অন্যান্য অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই সুযোগ চিরতরে বাতিল করুক ।

আমি এস. ই. ইসলাম দীর্ঘ ৫২ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে আয়কর উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত আছি এবং বিভিন্ন কর্মকর্তাদের আচরণবিধি লক্ষ্য ও পর্যালোচনা করে প্রতিবছরই বাজেট সম্পর্কে লেখালেখি করে আসছি। কিন্তু কোন সময় বা কোন বছরে স্বেচ্ছাচারিতা ও বিশেষ সরকারি ব্যক্তিবর্গের সহানুভূতির সুযোগ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর নিজ সাধ্য মোতাবেক বাজেটের সার্থকতা তুলে ধরতে পারেনি। সেজন্য যতবারই সরকার বদল হয়েছে ততবারই বিভিন্ন খাতে করদাতাদের কে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। স্বচ্ছতা ও কর কর্মকর্তাদের সহানুভূতি ও আবেগের জায়গা থেকে পৌঁছাতে না পেরে কালো টাকা সাদা করার বিষয় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি করদাতারা। তারপরেও অনেক করদাতা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় করে অনেক কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পেয়েছেন। আবার অনেকে বেশি কর ধার্য করায় বিপাকেও পড়েছেন। তাই আমার মতে, আয়কর উপদেষ্টা হিসেবে, নতুন করে আর কোন কালো টাকা সাদা করার প্রভিশন রাখা উচিত নয়। একমাত্র বিদেশি বিনিয়োগকারিদেরকে, যারা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে বা করবে, তাদের বেলায় এবং তাদের অংশীদারদের (দেশীয় অথবা বিদেশি) যে কোন পর্যায়ের শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, মেনুফ্যাকচারিং ও সহায়ক ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য জনগণের চাকরির সুযোগ-সুবিধা বাড়াবার জন্য পাঁচ থেকে সাত বছরের ট্যাক্স ফ্রি বা ট্যাক্স হলিডে দেওয়া উচিত। এরপর থেকে তারা নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করতে বাধ্য থাকবে। আর মহিলাদের চাহিদা রক্ষার্থে এবং তাদের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথ যেন সুগম হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেও বাজেট প্রণয়ন করা উচিত।

আর টিআইবি এর সাথে আমি একমত পোষণ করছি। আমার মতে একজন বিচক্ষণ ও পারদর্শি কর ন্যায়পাল নিয়োগ করা অতীব জরুরী। যার দায়িত্ব হবে এনবিআরকে সঠিক পথে চালানোর ব্যাপারে সুপরামর্শ প্রদান করা এবং ট্যাক্স আদায় করার কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা। প্রকৃত অর্থে, করদাতা গনকে সহজীকরণ পদ্ধতিতে কর প্রদানের বাধ্য করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা নির্দেশনাবলি জারি করা। এর ফলে এনবিআর বিভক্তিকরনের কোন প্রয়োজন হবে না। এনবিআরের চেয়ারম্যান কেবল একজনই থাকবে। যেহেতু কর ন্যায়পালের আদেশক্রমে এনবিআর পরিচালিত হবে। এটিই হচ্ছে আমার এবারের বাজেট ২০২৫-২০২৬ সম্পর্কে শেষ মন্তব্য।

লেখক : এস. ই. ইসলাম, বিশিষ্টি আয়কর উপদেষ্টা।

ট্যাগ:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক তথ্য সম্পর্কে

ছয় দিন ধরে বন্ধ চার চা বাগান, ডিসির কাছে শ্রমিকদের স্মারকলিপি

২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেট হতাশাপূর্ণ

আপডেটের সময় : ০১:৪৯:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫

এস, ই ইসলাম

========================

অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ গত ২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যাহা বিপ্লবি সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক বলে তারা বিবেচনা করছেন। কিন্তু প্রত্যাশার বাজেট হতাশার বাজেটে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এই সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬: অবহেলিতরা কী পেয়েছে’ শীর্ষক বহুপক্ষীয় অংশীজন বৈঠকে এসব কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেট নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রত্যাশার বাজেট হতাশার বাজেটে পরিণত হয়েছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একটা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বাজেট প্রণয়নের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু বাজেটে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদে (ক্যাবিনেট) অনুমোদন ছাড়াই বাজেটটি এসেছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটকে সুযোগ হারানোর (মিস অপরচুনিটিস) বাজেট বলা যায়। বাজেটে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বেশ বড় একটা ফারাক দেখতে পাচ্ছি। মূল সমস্যাটা হলো, পুরোনো বাজেটের কাঠামোর মধ্যেই নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বাজেটে যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়।’

সেলিম রায়হান আরও বলেন, শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও রয়েছে। কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। সামাজিক সুরক্ষা খাতে কিছু পুনর্গঠন হয়েছে, কিন্তু খুব বড় ধরনের কোনো পুনর্গঠন দেখা যায়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের যে বরাদ্দ হয়েছে, এটাও অনেক কম। অথচ বাজেটে এবার একটা ভিন্ন কিছু করার সুযোগ ছিল।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত বাজেট হলো সুযোগ হারানোর বাজেট। তবে আমি বলব, এবারের বাজেট হচ্ছে “লস্ট অপরচুনিটি”। কিন্তু গতানুগতিক একটা বাজেট হওয়ায় আমরা দুর্বল হয়ে গেলাম।’

ফওজিয়া মোসলেম বাজেটকে সমৃদ্ধ করতে নারীর প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে:
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনটির সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। ঢাকা, ১৭ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেছেন, জাতীয় বাজেটকে সমৃদ্ধ করতে নারীর প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে। বাজেটের বরাদ্দ যদি ঠিক না থাকে তাহলে, কোনখানে বরাদ্দটা বেশি হতে হবে সেই গুরুত্বটা বোঝা যাবে না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনটির সভাপতি এসব কথা বলেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, ‘আমাদের সবার লক্ষ্যটা বাজেটে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই প্রতিফলনের ফলে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা দেখা।’

সমাজের অত্যন্ত গভীরে নারীর প্রতি বিদ্বেষ জমা হয়ে আছে উল্লেখ করে মহিলা পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘আমরা বলতেছি যে নারীর প্রতি বৈষম্য কমছে কিন্তু আমরা গত আটুনয় মাসে যেটা দেখলাম, সমাজের অত্যন্ত গভীরে নারীর প্রতি বিদ্বেষ জমা হয়ে আছে। যেটা বিস্ফোরণ ঘটল, এখনো চলছে।’

মহিলা পরিষদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী। তিনি বলেন, ২০২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বরাদ্দের তুলনায় ২০২৫ অর্থবছরে লিঙ্গ-সম্পর্কিত বরাদ্দ ৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৪ দশমিক ৯ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২০২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৬০ হাজার ৭৬৬ দশমিক ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন বলেন, জেন্ডার বাজেটিং আগে একসময় ছিল না, এখন এগুলো শুরু হয়েছে এবং সে ক্ষেত্রে মহিলা পরিষদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। একটা অস্থির পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই সরকার যাচ্ছে, সেটা সবাই জানে। এ কারণে খুব বেশি প্রত্যাশা করাটা হয়তো ঠিক হবে না।

সভার শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। বৈশ্বিক এবং জাতীয় পর্যায়ে অনেক নীতিমালা গৃহীত হয়েছে, অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে কিন্তু আমরা জানি যে সেখানে বিনিয়োগটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবায়ন পর্যায়ে এবারের জাতীয় বাজেটে কতটুকু ‘‘জেন্ডার সৃজনশীল প্রতিফলন’’ হয়েছে, সেটা আমরা আসলে দেখতে চাই।’

মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুনের সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সানেমের ডেপুটি ডিরেক্টর ইশরাত শারমিন, ইউএনডিপির জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক উম্মে মারজান, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, দলিত নারী ফোরামের প্রকল্প কর্মকর্তা তামান্না সিং বড়াইক প্রমুখ।

কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল হতে পারে

অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম বাজেট প্রস্তাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখলেও তা এখন বাতিল করতে পারে। ২২ জুন প্রস্তাবিত এ বাজেট পাস করা হবে। সেখানে কালোটাকা সাদা করার সুযোগটি নাুও রাখা হতে পারে।

দেশে আগে থেকেই আয়কর আইনের তফসিলের মাধ্যমে এত দিন কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত টাকায় ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করহার কয়েক গুণ বাড়িয়ে সুবিধাটি বহাল রাখার প্রস্তাব করেন। এর পর থেকেই তা নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা শুরু হয়। ফলে সরকার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেছে। সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব নেতাদের এক আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

অর্থ উপদেষ্টা ২ জুন নতুন বাজেট উপস্থাপন করেন। এতে তিনি অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট কেনার পাশাপাশি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখেন। তবে আগের চেয়ে করের পরিমাণ বাড়িয়েছেন তিনি। সে অনুযায়ী এলাকাভেদে আয়তন অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলেই টাকার উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, এমনটা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধরে নেবে বলে উল্লেখ করা হয়।

অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার ক্ষেত্রে দুটি শর্তও দেওয়া হয়। যদি আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনের অধীন কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে উদ্ভূত হয় এবং কোনো বৈধ উৎস থেকে উদ্ভূত না হয়, তাহলে কালোটাকা সাদা করা যাবে না।

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও পৌর এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ১০০ থেকে ২ হাজার টাকা কর প্রস্তাব করেন অর্থ উপদেষ্টা। এ ছাড়া একই সুবিধা পেতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ৫০ থেকে ৯০০ টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা এসে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বাতিল করেছিল। কিন্তু এই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা প্রথম বাজেটেই নতুন করে করহার বাড়িয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখার প্রস্তাব করেন।

সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের দেওয়া চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এক বছরের জন্য নগদ টাকার পাশাপাশি জমি, ফ্ল্যাট-প্লটসহ স্থাবর সম্পদ কেনার মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সর্বোচ্চ করহারের চেয়ে কম কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার এ সুবিধার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনা ছিল। এ সুযোগকে অনৈতিক ও সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক।

অবশেষে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কালোটাকা সাদা করার বিধান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু আয়কর আইনের তফসিলে রাখা কালোটাকা সাদা করার সুবিধা বহাল থাকে।

প্রায় সব সরকারের আমলেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর এ সুযোগ দেওয়া হলেও অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থসম্পদ বৈধ করায় কখনোই তেমন সাড়া মেলেনি।

এনবিআরের সূত্রগুলো বলছে, এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে অপ্রদর্শিত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঘোষণায় এসেছে, অর্থাৎ সাদা করা হয়েছে। বিএনপি সরকারের ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ ছিল না।

সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশ থেকে পাচার করা টাকা ফেরত আনার সুযোগ দেওয়া হলেও কেউ সুযোগটি নেননি। এর এক বছর পরই আবারও কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়।

টিআইবি (ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ইধহমষধফবংয) ২০২৫‑২৬ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে প্রধানত নিম্নলিখিত মন্তব্য করেছে:

১. কালো টাকা সাদা করার সুযোগের তীব্র বিরোধ বাজেটে “অপ্রদর্শিত আয়” বৈধ করার সুযোগ চালু রাখার প্রস্তাবে টিআইবি তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলছে এই পদক্ষেপ “অনৈতিক, বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী” ।

নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করছে, যা স্পষ্টভাবে বলে অনুপার্জিত আয় অবৈধ” ।

২. রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি দমন কর্মসূচির বিপর্যয়

বাজেটে এই সুযোগ রাখার ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার, উপেক্ষিত হচ্ছে ।

এতে বলা হয়েছে, “সরকার রিয়েল এস্টেট লবির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে” ও দুর্নীতিকে উৎসাহ দান করেছে ।

৩. ইদানীং অপ্রদর্শিত আয় ‘সাদা’ হওয়ার আশঙ্কা

টিআইবি সতর্ক করেছে যে, বাজেটে থাকা এই নিয়ম কালো টাকা উৎপাদনের প্রবণতা বাড়ানোর পাশাপাশি তা পরবর্তীতে বৈধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে ।

৪. দ্রুত ও স্থায়ী বাতিলের দাবি

তারা দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংশোধিত বাজেট বা অন্যান্য অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই সুযোগ চিরতরে বাতিল করুক ।

আমি এস. ই. ইসলাম দীর্ঘ ৫২ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে আয়কর উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত আছি এবং বিভিন্ন কর্মকর্তাদের আচরণবিধি লক্ষ্য ও পর্যালোচনা করে প্রতিবছরই বাজেট সম্পর্কে লেখালেখি করে আসছি। কিন্তু কোন সময় বা কোন বছরে স্বেচ্ছাচারিতা ও বিশেষ সরকারি ব্যক্তিবর্গের সহানুভূতির সুযোগ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর নিজ সাধ্য মোতাবেক বাজেটের সার্থকতা তুলে ধরতে পারেনি। সেজন্য যতবারই সরকার বদল হয়েছে ততবারই বিভিন্ন খাতে করদাতাদের কে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। স্বচ্ছতা ও কর কর্মকর্তাদের সহানুভূতি ও আবেগের জায়গা থেকে পৌঁছাতে না পেরে কালো টাকা সাদা করার বিষয় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি করদাতারা। তারপরেও অনেক করদাতা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় করে অনেক কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পেয়েছেন। আবার অনেকে বেশি কর ধার্য করায় বিপাকেও পড়েছেন। তাই আমার মতে, আয়কর উপদেষ্টা হিসেবে, নতুন করে আর কোন কালো টাকা সাদা করার প্রভিশন রাখা উচিত নয়। একমাত্র বিদেশি বিনিয়োগকারিদেরকে, যারা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে বা করবে, তাদের বেলায় এবং তাদের অংশীদারদের (দেশীয় অথবা বিদেশি) যে কোন পর্যায়ের শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, মেনুফ্যাকচারিং ও সহায়ক ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য জনগণের চাকরির সুযোগ-সুবিধা বাড়াবার জন্য পাঁচ থেকে সাত বছরের ট্যাক্স ফ্রি বা ট্যাক্স হলিডে দেওয়া উচিত। এরপর থেকে তারা নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করতে বাধ্য থাকবে। আর মহিলাদের চাহিদা রক্ষার্থে এবং তাদের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথ যেন সুগম হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেও বাজেট প্রণয়ন করা উচিত।

আর টিআইবি এর সাথে আমি একমত পোষণ করছি। আমার মতে একজন বিচক্ষণ ও পারদর্শি কর ন্যায়পাল নিয়োগ করা অতীব জরুরী। যার দায়িত্ব হবে এনবিআরকে সঠিক পথে চালানোর ব্যাপারে সুপরামর্শ প্রদান করা এবং ট্যাক্স আদায় করার কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা। প্রকৃত অর্থে, করদাতা গনকে সহজীকরণ পদ্ধতিতে কর প্রদানের বাধ্য করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা নির্দেশনাবলি জারি করা। এর ফলে এনবিআর বিভক্তিকরনের কোন প্রয়োজন হবে না। এনবিআরের চেয়ারম্যান কেবল একজনই থাকবে। যেহেতু কর ন্যায়পালের আদেশক্রমে এনবিআর পরিচালিত হবে। এটিই হচ্ছে আমার এবারের বাজেট ২০২৫-২০২৬ সম্পর্কে শেষ মন্তব্য।

লেখক : এস. ই. ইসলাম, বিশিষ্টি আয়কর উপদেষ্টা।